গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বুধবার, ২৫ মার্চ ২০২৬

মেনু

সহিংসতামুক্ত নির্বাচন ও মানবাধিকার রক্ষাই হোক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান অঙ্গীকার

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ২১:৪৬ পিএম, ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ০০:৪০ এএম ২০২৬
সহিংসতামুক্ত নির্বাচন ও মানবাধিকার রক্ষাই হোক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান অঙ্গীকার
ছবি

নির্বাচন কমিশন

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে জনমনে যেমন প্রত্যাশা রয়েছে, তেমনি উদ্বেগ ও শঙ্কাও। অতীত অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়েছে- নির্বাচনের আগে ও পরে রাজনৈতিক সহিংসতা, দমন-পীড়ন, গুম, নির্বিচার গ্রেফতার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্বের ঝুঁকি বাস্তব ও গুরুতর। এমন প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ডের আহ্বান বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। 
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে লেখা এক খোলা চিঠিতে অ্যাগনেস ক্যালামার্ড বলেছেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন এবং তার আগের সময়টি হবে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার এবং আইনের শাসনের প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিশ্রুতির একটি ‘পরীক্ষা’। এখন যে সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হবে, তা আগামী বহু বছরের জন্য বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির গতিপথ নির্ধারণ করে দেবে। তাই সবাই যেন অবাধে, নিরাপদে এবং নিশঙ্ক চিত্তে দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণের এ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন- তা নিশ্চিত করে প্রকৃত নেতৃত্বের পরিচয় দেওয়ার এই সুযোগ অন্তর্বর্তী সরকারকে কাজে লাগাতে হবে।
নির্বাচনকালীন ও নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘন যেন না ঘটে এবং ঘটলেও তা যেন দ্রুত ও কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা হয়- এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব। 
আমরা এই আহ্বানের সঙ্গে পূর্ণ একাত্মতা প্রকাশ করছি এবং আরো জোর দিয়ে বলতে চাই- এটি কোনো বাহ্যিক চাপ নয়, বরং রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব।
মনে রাখা জরুরি যে, নির্বাচন কেবল ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নয়। এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার চর্চার সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র। ভোট দেওয়ার অধিকার, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার- এসব অধিকার সুরক্ষিত না থাকলে নির্বাচন অর্থহীন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেখা গেছে, নির্বাচন এলেই বিরোধী মত দমন, কর্মী-সমর্থকদের ওপর হামলা, সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীদের হুমকি দেওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এই চক্র ভাঙতে না পারলে ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য’ নির্বাচন শুধু সেøাগানেই থেকে যাবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত আস্থার পরিবেশ তৈরি করা। সে আস্থা আসবে কেবল কথায় নয়, দৃশ্যমান পদক্ষেপে। প্রথমত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে পেশাদার আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। নির্বিচার গ্রেফতার, হয়রানি ও বল প্রয়োগের অভিযোগগুলোয় দ্রুত, স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্ত জরুরি। দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নিলে বার্তা যাবে ভুল যে, ক্ষমতার অপব্যবহার করেও পার পাওয়া যায়।
দ্বিতীয়ত, মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় বিশেষ নজর প্রয়োজন। গণমাধ্যম, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিন্নমত প্রকাশ যেন অপরাধে পরিণত না হয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা সংক্রান্ত আইনের অপব্যবহার বন্ধ করা এবং নির্বাচনকালে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। তথ্য গোপন নয়, বরং তথ্যের অবাধ প্রবাহই গুজব ও সহিংসতা কমাতে সাহায্য করে। যখন সত্য তথ্য প্রকাশ জোরপূর্বক বন্ধের উদ্যোগ-পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তখন অপতথ্যের বিস্তৃতি ঘটার শঙ্কাও বেড়ে যায়।
তৃতীয়ত, রাজনৈতিক দলগুলোর সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। সমাবেশ, প্রচার ও সংগঠনের ক্ষেত্রে বৈষম্য হলে সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। প্রশাসনের দায়িত্ব হলো- আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করা। নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও সক্ষমতা দৃশ্যমানভাবে জোরদার করা না গেলে আস্থা সংকট কাটবে না।
নির্বাচন-পরবর্তী সময়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ফল ঘোষণার পর প্রতিশোধমূলক সহিংসতা, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা কিংবা বিরোধী কর্মীদের টার্গেট করার নজির আমাদের অজানা নয়। এই সময় দ্রুত প্রতিক্রিয়া, ক্ষতিগ্রস্তদের সুরক্ষা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিটি অভিযোগ নথিভুক্ত করা, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা- এসব পদক্ষেপ রাষ্ট্রের মানবিক মুখকে শক্তিশালী করে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের আহ্বানকে ‘বিদেশি হস্তক্ষেপ’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। মানবাধিকার সর্বজনীন। এর সুরক্ষা কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে এড়িয়ে যাওয়ার অবকাশ নেই; বরং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড মেনে চলাই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পরিচয়।
পরিশেষে বলতে চাই, সহিংসতামুক্ত নির্বাচন কোনো একক সরকারের কৃতিত্ব নয়। এটি জাতির অর্জন। অন্তর্বর্তী সরকার যদি সাহসী, নিরপেক্ষ ও মানবাধিকারবান্ধব ভূমিকা নিতে পারে; তাহলে সেটি শুধু একটি নির্বাচন নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি ইতিবাচক নজির স্থাপন করবে। আমরা জোরালোভাবে দাবি করি- এই নির্বাচন হোক ভয়মুক্ত, রক্তপাতহীন ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। কারণ তখনই গণতন্ত্রের প্রকৃত জয় হয়- যখন রাষ্ট্র তার নাগরিককে ভয় নয়, মর্যাদা দেয়।

সানা/আপ্র/৩১/০১/২০২৬

 

সংশ্লিষ্ট খবর

ঈদ হোক মমতার মহোৎসব
১৯ মার্চ ২০২৬

ঈদ হোক মমতার মহোৎসব

আলোকিত হৃদয়ের ডাক

কৃষক, খাল ও রাষ্ট্রদর্শনের পুনর্জাগরণ
১৮ মার্চ ২০২৬

কৃষক, খাল ও রাষ্ট্রদর্শনের পুনর্জাগরণ

মাটির শিরায় জলের প্রত্যাবর্তন

যুদ্ধের চাপ বাংলাদেশে, এখনই দূরদর্শী নীতির সময়
১৭ মার্চ ২০২৬

যুদ্ধের চাপ বাংলাদেশে, এখনই দূরদর্শী নীতির সময়

বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে-দূরের সংঘাতের মূল্য শেষ পর্যন্ত দিতে হয় সাধারণ মানুষকে। মধ্য...

ঈদযাত্রায় শুধু আশ্বাস নয়, বাস্তব স্বস্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক
১৫ মার্চ ২০২৬

ঈদযাত্রায় শুধু আশ্বাস নয়, বাস্তব স্বস্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক

ঈদ ঘিরে প্রতি বছরই দেশের বড় শহরগুলো থেকে গ্রামে ফেরার বিশাল মানবস্রোত তৈরি হয়। কর্মব্যস্ত নগরজীবনে ছ...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই