গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বুধবার, ১৩ মে ২০২৬

মেনু

কাপাসিয়ার রক্তে রঞ্জিত পরিবারের প্রশ্ন- মানুষ কেন আপনজনের খুনি হয়

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ০০:৫১ পিএম, ১৩ মে ২০২৬ | আপডেট: ০২:৫০ এএম ২০২৬
কাপাসিয়ার রক্তে রঞ্জিত পরিবারের প্রশ্ন- মানুষ কেন আপনজনের খুনি হয়
ছবি

ফাইল ছবি

গাজীপুরের কাপাসিয়ায় একই পরিবারের পাঁচ সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনা আমাদের সময়ের এক ভয়াবহ সামাজিক দলিল। এটি কেবল একটি অপরাধ নয়; এটি এমন এক জটিল বাস্তবতার বহিঃপ্রকাশ, যেখানে ব্যক্তি মনস্তত্ত্ব, পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক কাঠামো এবং নৈতিক অবক্ষয় একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে এক ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণে পরিণত হয়েছে। একজন বাবা, যিনি সন্তানের জন্য জীবন উৎসর্গ করার প্রতীক, তিনি যখন নিজের সন্তানদেরই হত্যা করেন-তখন এটি মানবিকতার গভীরতম সংকটের ইঙ্গিত দেয়।

এই ঘটনার নৃশংসতা যেমন শারীরিক, তেমনি এর অন্তর্নিহিত কারণগুলো মানসিক ও সামাজিকভাবে আরো গভীর। পারিবারিক কলহ, দাম্পত্য অশান্তি, দ্বিতীয় বিয়ের পরিকল্পনা, সন্দেহ, অর্থনৈতিক চাপ এবং মাদকাসক্তির সম্ভাব্য সংশ্লেষ-সব মিলিয়ে এটি এক বহুমাত্রিক সংকটের চিত্র। প্রাথমিক তদন্তে পারিবারিক দ্বন্দ্বকে কেন্দ্রীয় কারণ হিসেবে দেখা হলেও, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন ঘটনা কখনোই একক কারণে ঘটে না; বরং দীর্ঘমেয়াদি মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপের সম্মিলিত ফল এটি। 
মনোবিজ্ঞানের আলোকে এই ঘটনাকে বিশ্লেষণ করলে মানুষের অন্তর্গত দ্বন্দ্ব ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ভাঙন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ডাচ লেখক রুটখার ব্রেগমান মানুষের সহিংসতা নিয়ে লিখেছিলেন-মানুষ সাধারণত দূর থেকে আঘাত করে, কাছ থেকে নয়; কিন্তু যখন সে গভীর অন্ধকারে ডুবে যায়, তখন সবচেয়ে কাছের মানুষই তার শিকার হয়। এই ঘটনাও যেন সেই তত্ত্বের নির্মম বাস্তব উদাহরণ।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিনের হতাশা, দাম্পত্য সংকট, দমিত ক্ষোভ ও মানসিক চাপ মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে দেয়। এক পর্যায়ে আবেগ, রাগ বা প্রবল বাসনা আচরণের নিয়ন্ত্রণ নেয়। তখন ব্যক্তি বাস্তবতা ও নৈতিকতার সীমা অতিক্রম করতে পারে। একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের ভাষায়, “দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ থাকলে আচরণে আবেগ ও রাগ প্রাধান্য পায়।”

সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এখানে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। মানুষের মনের ‘ইড’ অংশ তাড়না ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করে, যা তাৎক্ষণিক তৃপ্তি চায়; ‘ইগো’ বাস্তবতার সঙ্গে সমন্বয় করে; আর ‘সুপার ইগো’ নৈতিকতার নিয়ন্ত্রক। যখন এই তিন স্তরের ভারসাম্য নষ্ট হয়, তখন মানুষ নৈতিকতা হারিয়ে ফেলতে পারে। কাপাসিয়ার ঘটনায় সেই ভারসাম্যহীনতার চরম রূপই প্রতিফলিত হয়েছে।

তবে মনোবিজ্ঞানীরা সতর্ক করে দিয়েছেন-কোনো একক তত্ত্ব দিয়ে এমন হত্যাকাণ্ড ব্যাখ্যা করা যায় না। মানসিক অসুস্থতা যেমন সাইকোসিস, সিজোফ্রেনিয়া বা মাদকনির্ভরতা সহিংস আচরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে, কিন্তু এগুলো নিশ্চিত কারণ নয়। বরং সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পারিবারিক প্রেক্ষাপট একত্রে কাজ করে।

সমাজবিজ্ঞানী দৃষ্টিকোণ থেকে এই ঘটনা আরো গভীর তাৎপর্য বহন করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাদেকা হালিমের মতে, পারিবারিক সহিংসতা কখনোই হঠাৎ ঘটে না; দীর্ঘদিনের দাম্পত্য অশান্তি, দমিত ক্ষোভ ও সম্পর্কের টানাপোড়েন ধীরে ধীরে ভয়াবহ পরিণতির দিকে নিয়ে যায়। তিনি আরো বলেন, অর্থনৈতিক চাপ, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, মাদকাসক্তি ও পারিবারিক দ্বন্দ্ব মানুষের মানসিক অস্থিরতা বাড়িয়ে দেয়, যা অনেক সময় বিকল্প সম্পর্ক বা দ্বিতীয় বিয়ের মতো সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে-আর সেখান থেকেই নতুন সংকট তৈরি হয়।

এই বিশ্লেষণ আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরে-পরিবার এখন আর আগের মতো নিরাপদ আশ্রয় নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি হয়ে উঠছে মানসিক চাপ, সহিংসতা ও অবিশ্বাসের কেন্দ্র। এর পেছনে রয়েছে নৈতিক শিক্ষার অভাব, আত্মনিয়ন্ত্রণের ঘাটতি এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার সংকট।

মাদকাসক্তি এই পরিস্থিতিকে আরো ভয়াবহ করে তোলে। মাদক মানুষের বিচারবোধকে ধ্বংস করে, বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে এবং সহিংস আচরণের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ায়। যখন একজন ব্যক্তি নেশার প্রভাবে নিজের বিবেক হারিয়ে ফেলে, তখন সে আর সামাজিক সত্তা হিসেবে কাজ করে না; বরং হয়ে ওঠে অপ্রত্যাশিত ও বিপজ্জনক। কাপাসিয়ার ঘটনায় মাদকসেবনের আলামত এই আশঙ্কাকেই জোরালো করে।

একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর সমাজব্যবস্থাও সম্পর্কের জটিলতা বাড়িয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের যোগাযোগ সহজ করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে তৈরি করেছে সন্দেহ, পরকীয়া ও সম্পর্কের ভাঙনের নতুন ক্ষেত্র। যখন নৈতিক শিক্ষা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ দুর্বল থাকে, তখন এই মাধ্যমগুলো সম্পর্ককে সুদৃঢ় করার বদলে ভেঙে দেয়।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অপরাধ-পরবর্তী আচরণ। কাপাসিয়ার ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তি হত্যার পর স্বজনকে ফোন করে নিজের অপরাধ স্বীকার করেন। মনোবিজ্ঞানীরা এটিকে ‘আবেগের অবনমন’ বা মানসিক চাপ লাঘবের প্রচেষ্টা হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তীব্র আবেগের বিস্ফোরণের পর অনেক সময় অপরাধবোধ, ভয় ও অনুশোচনা তৈরি হয়, যা ব্যক্তিকে কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে প্ররোচিত করে।  

তবে এই সমস্ত ব্যাখ্যা কোনোভাবেই অপরাধকে বৈধতা দেয় না। বরং এগুলো আমাদের সতর্ক করে যে, সমাজে এমন বিপজ্জনক মানসিক ও সামাজিক অবস্থা তৈরি হচ্ছে, যা সময়মতো প্রতিরোধ করা না গেলে আরো ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো-সমাজ হিসেবে আমাদের দায় কতটুকু? প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, ওই পরিবারে দীর্ঘদিন ধরে কলহ ও সহিংসতা চলছিল। কিন্তু সেই সংকট কখনো কার্যকরভাবে সমাধান করা হয়নি। আমাদের সমাজে পারিবারিক সমস্যাকে ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে দেখার প্রবণতা এখনো প্রবল। ফলে সংকট জমতে জমতে বিস্ফোরিত হয়।

এটি একটি বৈজ্ঞানিক সত্য যে, পারিবারিক সহিংসতা একটি ‘প্রক্রিয়াগত সংকট’-যা ধাপে ধাপে তৈরি হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, অর্থনৈতিক নির্ভরতা, পারিবারিক চাপ এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা সহিংসতার ঝুঁকি বাড়ায়। আবার উন্নয়নশীল দেশে পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা অনেক সময় রিপোর্টই হয় না, ফলে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে দেরি হয়ে যায়।

অতএব, এই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধ করতে হলে কেবল আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন একটি সমন্বিত, বিজ্ঞানভিত্তিক সামাজিক কাঠামো।

প্রথমত, মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে সহজলভ্য করতে হবে। প্রতিটি উপজেলায় কাউন্সেলিং কেন্দ্র স্থাপন এবং পরিবারভিত্তিক মানসিক সহায়তা চালু করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, দাম্পত্য ও পারিবারিক সম্পর্কের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ-যেমন বিবাহপূর্ব ও বিবাহোত্তর কাউন্সেলিং-ব্যবস্থা চালু করতে হবে। তৃতীয়ত, মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পুনর্বাসন কর্মসূচি জোরদার করতে হবে।

চতুর্থত, শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিকতা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও সহমর্মিতার শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। পঞ্চমত, কমিউনিটি পর্যায়ে সামাজিক নজরদারি ও সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে প্রতিবেশী, স্থানীয় নেতৃত্ব ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে।

সবশেষে, প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে-সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নৈতিক আচরণ, পারিবারিক মূল্যবোধ ও সম্পর্কের গুরুত্ব নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

কাপাসিয়ার এই ঘটনা আমাদের জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা। এটি দেখিয়ে দিয়েছে, মানুষের ভেতরের অন্ধকার যখন সামাজিক অবহেলার সঙ্গে মিলে যায়, তখন সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়-পরিবার-পরিণত হতে পারে মৃত্যুকূপে। এই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসতে হলে আমাদের প্রয়োজন নৈতিক পুনর্জাগরণ, সামাজিক সংহতি এবং বিজ্ঞানভিত্তিক সমাধানের সমন্বিত প্রয়োগ। নইলে আজকের কাপাসিয়া আগামী দিনের আরো বড় ট্র্যাজেডির পূর্বাভাস হয়ে থাকবে।
লেখক: বার্তা সম্পাদক, আজকের প্রত্যাশা ও সাংস্কৃতিককর্মী
সানা/আপ্র/১৩/৫/২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

সুশাসনের স্বপ্নে এক মানবিক বাংলাদেশ
১০ মে ২০২৬

সুশাসনের স্বপ্নে এক মানবিক বাংলাদেশ

অধ্যাপক ড. মোহা. হাছানাত আলী বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। এই ভূখণ্ডের জন্মই হয়েছে সংগ্রাম, স্বপ্ন ও আ...

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের কারণ এবং তার প্রভাব
১০ মে ২০২৬

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের কারণ এবং তার প্রভাব

আব্দুর রহমান পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি বড় জয় পেয়েছে। ২৯৪ আসনের বিধানসভা...

স্বজনপ্রীতি ও আঞ্চলিকতা জাতীয় ঐক্যের অন্তরায়
০৯ মে ২০২৬

স্বজনপ্রীতি ও আঞ্চলিকতা জাতীয় ঐক্যের অন্তরায়

মনজুরুল আলম মুকুলস্বাধীনতার পর দেশে অনেক গণআন্দোলন হয়েছে। বন্দুকের নলের সামনে আগে কাউকে কখনও এমন বুক...

শিক্ষায় অশনিসংকেত
০৯ মে ২০২৬

শিক্ষায় অশনিসংকেত

বিমল সরকারশুনতে যেমনই শোনা যাক, বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে গত এক-দেড় দশকে উপজেলা পর্যায়ে সরকারি...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই