বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফকে পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকারের জমি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনার মধ্যে বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রনধীর জয়সওয়াল।
মঙ্গলবার (১২ মে) নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন তিনি। এ সময় বেশ কিছু সাংবাদিক বাংলাদেশ সম্পর্কে জওসওয়ালকে নানা ধরনের প্রশ্ন করেন।
এবিপির এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, পশ্চিমবঙ্গের নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য বিএসএফকে জমি প্রদানের অনুমোদন দিয়েছেন। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন এবং এটি ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্কে প্রভাব ফেলবে কিনা?
জবাবে জওসওয়াল বলেন, ‘সীমান্ত নিরাত্তা আমাদের অগ্রাধিকার এবং আমরা এটাকে এভাবেই দেখি।’
তবে পশ্চিমবঙ্গের এই সিদ্ধান্ত উভয় দেশের সম্পর্কে প্রভাব ফেলবে কিনা তা নিয়ে প্রশ্নের জবাব দেননি মুখপাত্র।
বিজনেস ইন্ডিয়া পত্রিকার সাংবাদিকের প্রশ্ন ছিল, বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে ভারতবিরোধী বিক্ষোভ চলছে; স্লোগান দেওয়া হচ্ছে যে ভারতীয় পণ্য কেনা উচিত নয়। পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ফলাফল নিয়েও তারা ‘অসন্তুষ্ট’ এবং ভারতকে বিভিন্ন বিষয়ে অভিযুক্ত করা হচ্ছে। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো বক্তব্য আছে কিনা?
এ প্রশ্নেরও স্পষ্ট উত্তর দেননি জয়সওয়াল। তিনি বলেন, ‘আগেই ইঙ্গিত দিয়েছি, আমরা এই সম্পর্ককে একটি ইতিবাচক দিকে নিয়ে যাচ্ছি। কিছুদিন আগে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারত সফর করেন। সেখানে নতুন সরকার গঠনের উদযাপনে যোগ দিতে ভারতের স্পিকার গিয়েছিলেন। বর্তমানে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের গতিপথ এটিই।’
দ্য হিন্দুর এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, ‘বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, বাংলাদেশ অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করে। তিনি মূলত ইউরোপে যাওয়ার পথে বাংলাদেশি অবৈধ অভিবাসীদের নেওয়া বিপজ্জনক রুটগুলোর প্রেক্ষাপটে এই কথাটি বলেছেন। আপনার কি মনে হয়, অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের এই নীতি তারেক রহমান সরকারের ভারতের ক্ষেত্রেও অনুসরণ করা উচিত?’
জবাবে একে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে আলোচনার বিষয় হিসেবে তুলে ধরে জয়সওয়ালের দাবি, গত কয়েক বছর ধরে ভারত বাংলাদেশের কাছে ২ হাজার ৮৬০ জনেরও বেশি মানুষের জাতীয়তা যাচাইয়ের অনুরোধ জানিয়ে আসছে; যাদেরকে তারা বাংলাদেশি বলে মনে করে। কিন্তু এ বিষয়ে ভারত এখনো কোনো সাড়া পায়নি।
সম্প্রতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের চীন সফর নিয়েও প্রশ্ন করেন এক সাংবাদিক। তার প্রশ্ন ছিল, ‘আমরা দেখেছি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী চীন সফরে গিয়েছেন এবং আগের সরকারের সিদ্ধান্তকে একপাশে সরিয়ে রেখে তিস্তা উন্নয়ন প্রকল্প চীনকে দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন। আপনি কি মনে করেন, এ ধরনের পদক্ষেপ পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে?’
বিষয়টি নিয়ে সরাসরি জবাব না দিয়ে জওসওয়ালের ভাষ্য, ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্কের চর্চাকারী ও কূটনীতিক হিসেবে এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা হিসেবে আমরা বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তের সব উন্নয়নের ওপর গভীর নজর রাখি। আপনি যে সফরের কথা বলেছেন, সেটির ক্ষেত্রেও একইভাবে নজর রাখছি। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক পারস্পরিক স্বার্থের কথা মাথায় রেখে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।’
বাংলাদেশসহ প্রতিবেশী দেশগুলোতে ভারতের জ্বালানি সহযোগিতা নিয়েও ব্রিফিংয়ে প্রশ্নের জবাব দেন মুখপাত্র।
তিনি বলেন, ‘আমাদের যে ‘হাই-স্পিড ডিজেল ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন’ রয়েছে, তার মাধ্যমে বাংলাদেশে ডিজেল সরবরাহ করছি। এছাড়া বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কিছু অতিরিক্ত অনুরোধও পেয়েছিলাম, যা পূরণ করেছি এবং করছি। আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোকে তাদের প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ করে সমর্থন অব্যাহত রেখেছি।’
বাংলাদেশ প্রসঙ্গ ছাড়াও এদিন বিফ্রিংয়ে পাকিস্তানে ২০২৫ সালের ৭ মে ভারতের চালানো সামরিক অভিযান ‘অপারেশন সিঁদুর’ এর সময় ইসলামাবাদকে চীনের সহায়তা করার যে তথ্য বিভিন্ন গণমাধ্যমে এসেছে তা নিয়েও কথা বলেন জয়সওয়াল।
তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, আমরা এমন কিছু প্রতিবেদন দেখেছি যা আগে থেকে জানা বিষয়গুলোকেই নিশ্চিত করে। অপারেশন সিঁদুর ছিল কাশ্মিরের পেহেলগামে হওয়া সন্ত্রাসী হামলার প্রেক্ষিতে একটি সুনির্দিষ্ট, লক্ষ্যকেন্দ্রিক এবং পরিমিত জবাব, যার উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানের মদতপুষ্ট এবং তাদের নির্দেশে পরিচালিত সন্ত্রাসী অবকাঠামোগুলো ধ্বংস করা।’
চীনকে ইঙ্গিত করে তার ভাষ্য, ‘যারা নিজেদের দায়িত্বশীল রাষ্ট্র বলে মনে করে, এখন তাদেরই ভেবে দেখার সময় এসেছে যে, সন্ত্রাসবাদী অবকাঠামোকে সুরক্ষা দেওয়ার এই প্রচেষ্টা তাদের বৈশ্বিক ভাবমূর্তি ও মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করছে কি না।’
সানা/আপ্র/১৩/৫/২০২৬