বাংলাদেশের রাজনীতিতে তরুণ নেতৃত্বের প্রত্যাশা নতুন নয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে সেই প্রত্যাশা বাস্তবতার মুখ দেখেনি। ২০২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের তরুণ নেতাদের হাত ধরে গড়ে ওঠা নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ওই শূন্যস্থান পূরণের আশ্বাস নিয়েই নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। ‘তারুণ্য ও মর্যাদার ইশতেহার’ শীর্ষক ৩৬ দফার এই ঘোষণাপত্রে তারা একটি বাস্তবসম্মত ও সংস্কারমুখী রূপরেখার কথা বলেছে; যা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ‘বাস্তবসম্মত ও সংস্কারমুখী রূপরেখা’ নির্মাণকে লক্ষ্য ধরে নির্বাচনি ইশতেহারে দলের রাষ্ট্রকল্প, নীতিগত অবস্থান এবং সংস্কারভিত্তিক রাজনৈতিক দর্শনের ধারাবাহিকতার কথা তুলে ধরে এনসিপি জানিয়েছে, জনগণের নিত্যদিনের সংগ্রাম, প্রত্যাশা ও রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক সমস্যা, এসব কিছুকে ভিত্তি করে এই লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে তারা। এনসিপির নির্বাচনী ইশতেহারের ভূমিকায় বলা হয়েছে, এটি কোনো একক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ধারণাপত্র নয়; জনগণের নিত্যদিনের সংগ্রাম, প্রত্যাশা ও রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক সমস্যা- সবকিছু ভিত্তি করে একটি বাস্তবসম্মত এবং সংস্কারমুখী রূপরেখা নির্মাণই এ ইশতেহারের উদ্দেশ্য। অর্থাৎ দলটির দাবি, ‘ইশতেহারের প্রতিটি অঙ্গীকার ন্যায্যতা, বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। এনসিপি নির্বাচনে জেতার জন্য জনগণকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে ধোঁকা দিতে চায় না। বর্তমান অর্থনৈতিক ও সমাজ বাস্তবতায় স্বপ্নের নতুন বাংলাদেশ গড়তে আগামী পাঁচ বছরে যতটুকু পরিবর্তন আনা সম্ভব, ততটাই এই ইশতেহারে এনসিপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলে দাবি দলটির।
ইশতেহারের ভাষা ও কাঠামোয় এনসিপি সচেতনভাবে প্রচলিত রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছে। জনগণের নিত্যদিনের সংগ্রাম, রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক সমস্যা এবং বিদ্যমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা সামনে রেখে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার কথা তারা বারবার উল্লেখ করেছে। ‘নির্বাচনে জেতার জন্য মিথ্যা আশ্বাস নয়’- এই বক্তব্য বর্তমান রাজনীতির প্রেক্ষাপটে আলাদা গুরুত্ব বহন করে। কারণ দেশের মানুষ বহুবার আকাশছোঁয়া প্রতিশ্রুতির মোহে পড়ে বাস্তবে হতাশ হয়েছে। তবে এখানেই এনসিপির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটি সামনে আসে। তা হলো বিশ্বাসযোগ্যতা। দলটির অনেক নেতার বিরুদ্ধে ইতোমধ্যেই অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। যদিও অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দোষী বলা যায় না, তবুও রাজনীতিতে ‘নৈতিক উচ্চতা’ প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে এসব বিষয়ে দলটির আরো স্পষ্ট ও কঠোর অবস্থান প্রত্যাশিত। সংস্কারমুখী রাজনীতির কথা বললে আগে নিজেদের ভেতরেই ওই সংস্কারের চর্চা শুরু করতে হবে।
ইশতেহারে অর্থনীতি, নারী, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা- এ চারটি খাতে আলাদা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে- যা ইতিবাচক দিক; বিশেষ করে নারীর মর্যাদা এবং অংশগ্রহণের প্রশ্নটি তরুণদের দল হিসেবে এনসিপির কাছ থেকে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে চায়। তবে ৮৬ পৃষ্ঠার ইশতেহারে যে প্রতিশ্রুতিগুলো তুলে ধরা হয়েছে, সেগুলোর বাস্তবায়ন কৌশল কতটা সুস্পষ্ট এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার বাস্তবতায় কতটা সম্ভব- এ প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট নয়। নতুন দল হিসেবে এনসিপির জনপ্রিয়তা প্রত্যাশিত মাত্রায় না হলেও তাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে। নির্বাচনী ফলাফল যাই হোক- যদি তারা নীতিগত দৃঢ়তা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার রাজনীতি চর্চা করতে পারে; তাহলে দেশের রাজনীতিতে একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক ধারার বিকল্প শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। শেষ পর্যন্ত জনগণ শুধু সুন্দর ইশতেহার নয়, কার্যকর ও সৎ রাজনৈতিক আচরণই দেখতে চায়। এনসিপির জন্য এই ইশতেহার ওই পরীক্ষার সূচনা মাত্র।
সানা/এসি/আপ্র/০১/০২/২০২৬