জাতীয় নির্বাচন শুধু ভোট গ্রহণের একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; রাষ্ট্রের সক্ষমতা, আইনের শাসন এবং নাগরিকের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রকাশ। কিন্তু আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে যে বিষয়টি ক্রমেই বড় উদ্বেগের হয়ে উঠছে, তা হলো মব সহিংসতার নিয়ন্ত্রণহীন বিস্তার। এই বাস্তবতায় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের সতর্কবার্তাকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। গত সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) টিআইবির কার্যালয়ে একটি গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপনের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে ড. জামান স্পষ্ট করে বলেছেন, সরকার যদি মব সহিংসতা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারে, তাহলে তার প্রভাব নির্বাচনের ওপর পড়বে। তিনি অভিযোগ করেছেন- ‘এক্ষেত্রে সরকারের দায় আছে। সরকার শুরু থেকে মব সহিংসতা প্রতিরোধে তৎপরতা দেখাতে পারেনি।’
ড. ইফতেখারুজ্জামান যে অভিযোগটি তুলেছেন- বাংলাদেশে মব সহিংসতার উৎপত্তি সরকারের ভেতর থেকেই-তা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। তার ভাষায়- ‘দেশের প্রশাসনিক কেন্দ্র সচিবালয়েই প্রথম মবের প্রকাশ ঘটেছিল। এর পর থেকেই সরকারের বাইরের বিভিন্ন শক্তি নিজেদের ক্ষমতাবান মনে করে একই পথ অনুসরণে উৎসাহিত হয়েছে। ফলে শুধু সামাজিক অস্থিরতাই বাড়েনি, দুর্বল হয়েছে রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিও।’ টিআইবি প্রধানের অভিযোগ কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিয়ে একটি বিশাল ও বাস্তব প্রশ্ন। কারণ যেখানে আইন কাজ করে না, সেখানে নির্বাচনও নিরাপদ থাকে না। মব সহিংসতার মূল সমস্যা হলো, এটি রাষ্ট্রের বিকল্প শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে। ব্যক্তির বিচার আদালতে হওয়ার কথা থাকলেও, মব সেখানে রায় দেয় রাস্তায়। ড. ইফতেখারুজ্জামানের অভিযোগ আরো গভীর উদ্বেগ তৈরি করে। যখন তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে মব সহিংসতার সূচনা সরকারের ভেতর থেকেই, এমনকি দেশের প্রশাসনিক কেন্দ্র সচিবালয়ে। এই বক্তব্য সত্য হলে প্রশ্ন উঠবেই- রাষ্ট্র নিজেই যখন আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার নজির তৈরি করে, তখন সাধারণ মানুষ বা বাইরের শক্তিগুলোকে থামাবে কে? এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি।
মবের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ায় এক ধরনের শাস্তিহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। ফলে একদিকে মব আরো সাহসী হচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ ক্রমেই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। এই ভয়ভিত্তিক বাস্তবতা নির্বাচনের পরিবেশকে স্বাভাবিক রাখতে পারে না। নির্বাচনের সময় সবচেয়ে প্রয়োজন হয় মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও ভোটারদের নিরাপত্তাবোধ। কিন্তু মব সহিংসতার উপস্থিতি সেই জায়গাতেই আঘাত হানে। মানুষ প্রশ্ন করতে ভয় পায়, ভিন্ন মত প্রকাশে ঝুঁকি দেখে, এমনকি ভোটকেন্দ্র পর্যন্ত যাওয়ার বিষয়েও শঙ্কা তৈরি হয়। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন যতই সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে অনুষ্ঠিত হোক, তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। সরকারের দায় এখানে এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। শুরু থেকেই মব সহিংসতা প্রতিরোধে যে দৃঢ়তা দেখানো দরকার ছিল, তার অভাব স্পষ্ট। কোথাও নীরবতা, কোথাও অকার্যকর প্রতিক্রিয়া- সব মিলিয়ে একটি ভুল বার্তা গেছে। তা হলো- মব সহিংসতায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নাও নেওয়া হতে পারে। এ বার্তাই পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান নির্বাচন কেন্দ্র করে আর কোনো হত্যাকাণ্ড না হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। এই আশাবাদ অবশ্যই প্রত্যাশিত। তবে আশাবাদ তখনই বাস্তবতা পায়, যখন তার সঙ্গে যুক্ত হয় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে মবের সঙ্গে কোনো রকম আপস নয়, বরং শূন্য সহনশীলতার নীতি কার্যকর করতে হবে। সুতরাং কেবল আশ্বাস নয়, এখন প্রয়োজন দৃশ্যমান ও কঠোর পদক্ষেপ। আসন্ন নির্বাচন রাষ্ট্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে সরকারকে স্পষ্ট করে দেখাতে হবে- কোনোপ্রকার মব বা ভয়ভীতির সংস্কৃতি নয়, আইনই শেষ কথা। গণমানুষের নিরাপত্তা ও ভোটাধিকার রক্ষা করাই হতে হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। কারণ গণতন্ত্র টিকে থাকে মানুষের আস্থায়। সেই আস্থা ভেঙে গেলে নির্বাচন কেবল একটি প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকে, গণতান্ত্রিক অর্জন হিসেবে নয়।
কেএমএএ/আপ্র/৪/২/২০২৬