শাকসবজি বা ফলমূল নয়, বরং সিগারেটের সঙ্গেই বেশি মিল রয়েছে প্রসেসড বা অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের। এসব খাবারের ক্ষেত্রে আরো কঠোর নিয়মকানুন প্রয়োজন বলে উঠে এসেছে নতুন এক গবেষণায়।
হার্ভার্ড ও ডিউকসহ যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ তিন ইউনিভার্সিটির গবেষকরা বলেছেন, ‘আল্ট্রা-প্রসেসড ফুড’ বা ইউপিএফ বা অতি প্রক্রিয়াজাত খাবার ও সিগারেট উভয়ই এমনভাবে তৈরি, যেন এগুলোতে মানুষ আসক্ত হয়ে পড়েন এবং বারবার খেতে থাকেন। উভয়ের মাধ্যমেই স্বাস্থ্যের ব্যাপক ক্ষতির বিষয়টিকে গবেষকরা সমান্তরাল হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ব্রিটিশ পত্রিকা গার্ডিয়ান লিখেছে, বিশ্বজুড়ে সহজলভ্য এসব প্রক্রিয়াজাত খাবার মূলত শিল্পকারখানায় উৎপাদিত হয়। এগুলো তৈরিতে প্রায়ই ‘ইমালসিফায়ার’ বা মিশ্রণকারী উপাদান, কৃত্রিম রং ও সুগন্ধি ব্যবহৃত হয়, যার মধ্যে রয়েছে কোল্ড ড্রিংকস বা কোমল পানীয় ও প্যাকেটজাত স্ন্যাকস, যেমন চিপস ও বিস্কুট।
হার্ভার্ড, মিশিগান ও ডিউক ইউনিভার্সিটির গবেষকরা বলছেন, অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার ও সিগারেট তৈরির প্রক্রিয়ার মধ্যে অনেক মিল রয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই উৎপাদনকারীরা পণ্যের ‘ডোজ’ বা মাত্রা এমনভাবে নির্ধারণ করে যেন তা শরীরে প্রবেশের পর খুব দ্রুত মস্তিষ্কের ভালো লাগার অনুভূতি বা ‘রিওয়ার্ড পাথওয়ে’কে সক্রিয় করতে পারে। ‘অ্যাডিকশন সায়েন্স’ বা আসক্তি বিজ্ঞান, পুষ্টি ও জনস্বাস্থ্যের ইতিহাস থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে এ তুলনাটি করেছেন গবেষকরা। তাদের এ গবেষণা প্রকাশ পেয়েছে স্বাস্থ্য বিষয়ক সাময়িকী ‘মিলব্যাংক কোয়ার্টারলি’তে।
গবেষকরা বলছেন, এসব পণ্যের গায়ে যখন ‘লো ফ্যাট’ বা কম চর্বিওয়ালা ও ‘সুগার ফ্রি’ লেখা থাকে তখন তা আসলে এক ধরনের ‘হেলথ ওয়াশিং’ বা মানুষকে ধোঁকা দেওয়ার কৌশল, যা কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়। ঠিক যেমন ১৯৫০-এর দশকে সিগারেটের ফিল্টারকে সুরক্ষামূলক উদ্ভাবন হিসেবে বিজ্ঞাপনে প্রচার করা হত, তবে বাস্তবে তা স্বাস্থ্যের জন্য তেমন কোনো কার্যকর সুবিধাই দেয় না।
বেশিরভাগ অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের বৈশিষ্ট্য ফলমূল বা শাকসবজির চেয়ে সিগারেটের সঙ্গে বেশি মেলে। ফলে জনস্বাস্থ্যের জন্য এগুলো যে পরিমাণ ঝুঁকি তৈরি করে সে অনুসারে এগুলোর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ জরুরি।
এ গবেষণার অন্যতম লেখক ও ‘মিশিগান ইউনিভার্সিটি’র আসক্তি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক অ্যাশলি গেরহার্ডট বলেছেন, তার রোগীরাও একই অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। আমার রোগীরা বলতেন, ‘আমি এসব খাবারে আসক্ত হয়ে পড়েছি। এগুলো খাওয়ার জন্য আমার মন ছটফট করে। আগে আমি সিগারেট খেতাম, এখন আমার সেই একই অভ্যাস তৈরি হয়েছে সোডা আর ডোনাটের ওপর। আমি জানি এগুলো আমাকে মেরে ফেলছে; আমি ছাড়তে চাই, তবে পারি না’। গেরহার্ডট বলেছেন, অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার নিয়ে এ বিতর্ক আসক্তির পুরানো চেনা ছকটিকেই অনুসরণ করছে।
আমরা সাধারণত কিছু সময়ের জন্য সব দোষ ব্যক্তির ওপর চাপিয়ে দিই এবং বলি, ‘ওহ, জানেন তো, সিগারেট বা মদে পরিমিতি থাকা উচিৎ’। তবে একটা সময় আমরা ঠিকই বুঝতে পারি, বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান আসলে এমন সব কৌশল ব্যবহার করে পণ্য তৈরি করে, যা মানুষকে পুরোপুরি দাসে পরিণত বা আসক্ত করে ফেলে। অধ্যাপক গেরহার্ডট বলেছেন, ক্ষতিকর অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার ও সাধারণ খাবারের মধ্যে পার্থক্য করা অবশ্যই সম্ভব। ঠিক যেভাবে পানীয়র তালিকায় সাধারণ পানীয় থেকে অ্যালকোহল বা মদজাতীয় পানীয়কে আলাদা করা হয়েছে এখানেও তেমনই করা উচিত।
গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, কোনো বস্তু আসক্তি তৈরি করে কি না তা বোঝার জন্য যে ‘মানদণ্ড’ ব্যবহৃত হয় এসব খাবার তাতে পুরোপুরি মিলে যায়। এগুলো এমনভাবে ডিজাইন হয়েছে, যা মানুষকে ‘ব্যবহারে বাধ্য করার’ দিকে ঠেলে দেয়। তবে গবেষকরা একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলেছেন, এগুলো আসক্তি তৈরি করুক বা না করুক স্বাস্থ্যের ওপর এগুলোর ক্ষতিকর প্রভাব একেবারে প্রমাণিত।
গবেষকরা পরামর্শ দিয়েছেন, তামাক বা সিগারেট নিয়ন্ত্রণের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে, যার মধ্যে রয়েছে ‘মামলা করা, এসব পণ্যের বিজ্ঞাপনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ ও গাঠনিক পরিবর্তন আনা’। অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের ক্ষতি কমাতে এসব পদক্ষেপ কার্যকর হতে পারে। গবেষকরা বলেছেন, জনস্বাস্থ্য রক্ষায় দায়ভার যেন কেবল ‘ব্যক্তির’ ওপর না চাপিয়ে ‘খাবার শিল্পে জবাবদিহিতা’ নিশ্চিতের দিকে সরানো হয়।
সানা/কেএমএএ/আপ্র/৪/২/২০২৬