পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব কেবল ক্লান্তিই আনে না, বরং মানুষের মস্তিষ্কের বিভিন্ন কোষকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে– এমনই উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়।
ইতালির ‘ইউনিভার্সিটি অফ ক্যামেরিনো’র গবেষকদের নেতৃত্বে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, পর্যাপ্ত সময় না ঘুমালে মানুষের মস্তিষ্কের নিউরন বা স্নায়ু কোষকে সুরক্ষিত রাখতে চর্বিওয়ালা যে আবরণটি রয়েছে তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যা মানুষের মস্তিষ্কের কাজের সক্ষমতা বা মানসিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হরে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সাইট সায়েন্সঅ্যালার্ট প্রতিবেদনে লিখেছে, বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে গবেষণা দলটি দেখেছে, এ ক্ষতির মূল কারণ ‘অলিগোডেন্ড্রোসাইট’ নামের এক কোষের রাসায়নিক ভারসাম্যহীনতা। এসব কোষ দেহের কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করে, যা ‘মায়েলিন’ নামের প্রতিরক্ষামূলক আবরণ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
গবেষণাপত্রে গবেষকরা লিখেছেন, গবেষণাটি নিশ্চিত করেছে, দেহের অলিগোডেন্ড্রোসাইট কোষগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ঘুমের অভাবের ফলে মায়েলিনের স্থায়িত্ব নষ্ট হওয়া, স্নায়বিক সংকেত ধীর হয়ে যাওয়া ও আচরণগত ত্রুটির মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে।
গবেষণায় অংশ নেওয়া ১৮৫ জন সুস্থ ব্যক্তির ‘এমআরআই’ স্ক্যান বিশ্লেষণ করেছেন গবেষকরা, যেখানে আগের বিভিন্ন গবেষণার ফলাফলের মতো আরো জোরালো প্রমাণ মিলেছে যে, যারা ঘুমের অভ্যাসের অবনতির কথা জানিয়েছেন তাদের মস্তিষ্কের ‘হোয়াইট ম্যাটার’ বা সাদা অংশের গঠনও দুর্বল হয়ে পড়েছে।
এরপর ১০ দিন ধরে ঘুম থেকে দূরে রাখা একদল ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা চালায় গবেষক দলটি। পরীক্ষায় উঠে এসেছে, এসব ইঁদুরের মস্তিষ্কের স্নায়ুতন্তুর আকারে কোনো পরিবর্তন না হলেও প্রতিটি নিউরনের মূল অংশ বা ‘অ্যাক্সন’-এর আশপাশের মায়োলিন আবরণটি স্বাভাবিক ইঁদুরের তুলনায় অনেক পাতলা হয়েছে।
পরবর্তী বিভিন্ন পরীক্ষায় উঠে এসেছে, পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া ইঁদুরগুলোর মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশের মধ্যে সংকেত আদান-প্রদান বা যোগাযোগ প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ধীর হয়েছে। এ ছাড়া ঘুমের অভাব মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের মধ্যে কাজের সমন্বয়ও কমিয়েছে।
মস্তিষ্কের যোগাযোগের জন্য ‘অ্যাক্সন’ গুরুত্বপূর্ণ। ঘুমের অভাবে মায়োলিন পাতলা হয়ে যাওয়ায় নিউরনের মধ্যকার পারস্পরিক সংকেত ধীর হয়ে যায়। ফলে মানসিক ক্লান্তি ও ‘ব্রেন ফগ’ বা চিন্তাভাবনায় অস্পষ্টতা তৈরির ঝুঁকি বাড়ে। এর প্রমাণ মিলেছে ইঁদুরগুলোর ওপর চালানো স্মৃতিশক্তি ও শারীরিক কসরত পরীক্ষায়।
ইঁদুরগুলোর ওপর করা এক জিনগত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এদের বিভিন্ন অলিগোডেন্ড্রোসাইট কোষ আগের মতো দক্ষতার সঙ্গে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না।
গবেষকরা লিখেছেন, আমাদের গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে, ঘুমের অভাবে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয় তা আমাদের আচরণগত ত্রুটির জন্য দায়ী হতে পারে। আমাদের এ গবেষণা ভবিষ্যতে এই সমস্যা সমাধানে চিকিৎসার নতুন পথ দেখাতে পারে।
গবেষকরা এখানেই থেমে থাকেননি। ঘুম না হওয়া ইঁদুরগুলোকে ‘সাইক্লোডেক্সট্রিন’ নামের এক ওষুধ দিয়েছে গবেষণা দলটি, যা এদের শরীরে কোলেস্টেরল সরবরাহ স্বাভাবিক করতে সাহায্য করেছে। ফলে ইঁদুরগুলোর স্মৃতিশক্তি ও চলাফেরার দক্ষতায় উন্নতি দেখা যায়, যা গবেষকদের ধারণাকে সত্যি বলেই প্রমাণ করেছে। তবে মনে রাখা জরুরি, এ গবেষণার বড় অংশটি প্রাণীর ওপর হয়েছে। ফলে মানুষের ক্ষেত্রে তা কতটা কার্যকর হবে তা নিশ্চিতের জন্য আরো গবেষণার প্রয়োজন। এসব সীমাবদ্ধতার পরও জোরালো প্রমাণ মেলে, ঘুমের অভাব কীভাবে মানুষের মস্তিষ্ককে ধীর করে দেয়।
যারা দীর্ঘস্থায়ী অনিদ্রা বা ঘুমের সমস্যায় ভুগছেন তাদের জন্য ভবিষ্যতে সহায়ক হতে পারে এ গবেষণা। অনিদ্রা কেবল ক্লান্তিই বাড়ায় না, বরং শরীরের অন্যান্য নানা রোগব্যাধিরও কারণ।
গবেষকরা বলছেন, আধুনিক সমাজে ঘুমের অভাব বড় এক জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সতর্কতা কমে যাওয়া, কাজের গতি ধীর হওয়া ও ভুলের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার মতো বিষয়গুলোই ঘুমের অভাবের প্রধান লক্ষণ। গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘পিএনএএস’-এ।
সানা/কেএমএএ/আপ্র/৪/২/২০২৬