ড. জাহাঙ্গীর আলম সরকার
রাজনীতিতে নীরবতা কখনো নিখুঁত নিরপেক্ষতা বহন করে না। আবার উচ্ছৃঙ্খল বা হঠকারী শোরগোলও সব সময় দুর্গঠিত বা অগোছালো নয়। অনেক সময়, সচেতন পরিকল্পনা ও কৌশলগত উদ্দেশ্য অনুসারে তৈরি শোরগোলই সবচেয়ে সূক্ষ্ম কৌশল হিসেবে কাজ করে- যার আড়ালে চাপা পড়ে জটিল প্রশ্ন, অস্বস্তিকর বাস্তবতা ও জবাবদিহির দাবির উপস্থিতি। এক অর্থে, এই শোরগোল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক প্রকার কৌঁসুলির ভাঁজে থাকা ছুরি; যা দৃশ্যমান নয়। কিন্তু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম।
সাম্প্রতিক মার্কিন রাজনীতির ঘটনাপ্রবাহে এই কৌশল স্পষ্টভাবে ধরা দিয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিজ্ঞতা ও বিতর্ক সৃষ্টি করার দক্ষতা এখানে অনন্য। প্রতিটি বিবৃতি, প্রতিটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পোস্ট বা আচরণ- প্রথমে হয়তো আবেগপ্রবণ ও অগোছালো মনে হতে পারে। তবে তা প্রায়ই একটি সুপরিকল্পিত কৌশলের অংশ। এই ধরনের কৌশল রাজনৈতিক খেলা এবং গণমাধ্যমের মনোযোগ পরিচালনার সূক্ষ্মতম পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
মূল বিষয়টি হলো- যখন কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি বা দলের প্রতি চাপ সৃষ্টি করতে চাওয়া হয়, তখন সরাসরি উত্তেজনা সৃষ্টি না করে একটি বহুমাত্রিক শোরগোল চালু করা হয়; যা মূল বিতর্ককে আড়াল করে দেয়। ফলে মূল প্রশ্ন- যা নাগরিক অধিকার, নৈতিক দায়বদ্ধতা বা প্রাসঙ্গিক নীতি নিয়ে; তা সহজেই চাপা পড়ে যায়। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড এই কৌশলকে যথাযথভাবে চিত্রায়িত করে: যেখানে প্রকাশ্য বিতর্ক, সামাজিক প্রতিক্রিয়া ও গণমাধ্যমের নজর- সব মিলিয়ে একটি ধারাবাহিক, পরিকল্পিত বিভ্রান্তি তৈরি হয়; যা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কার্যকরভাবে কোণঠাসা করে এবং সমালোচকদের মনোযোগকে ছড়িয়ে দেয়।
এক কথায়, এই শোরগোল রাজনৈতিক কৌশল; যা সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট ইস্যু মোকাবিলার বদলে আলোচনার ক্ষেত্রকে প্রসারিত করে এবং বিতর্ককে বহুস্তরীয় করে তোলে। প্রাথমিকভাবে যখন কোনো রাজনৈতিক ঘটনা অগোছালো বা হঠকারী মনে হয়, তা আসলে অনেক সময় এক সুপরিকল্পিত কৌশলের ফল। এই কৌশলটির উদ্দেশ্য একাধিক স্তরে কাজ করা- সমর্থকদের মধ্যে সংহতি জাগানো, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করা, এবং প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করে তাদের কার্যকর প্রতিক্রিয়া দেওয়া কঠিন করা। অর্থাৎ যা দেখায় অগোছালো বা আকস্মিক, তার পেছনে প্রায়শই একটি নির্ধারিত রাজনৈতিক পরিকল্পনা লুকিয়ে থাকে।
ট্রুথ সোশ্যালে প্রকাশিত একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ভিডিও- যেখানে বারাক ও মিশেল ওবামাকে বানরের রূপে দেখানো হয়েছে। প্রথম দর্শনে অনেকের কাছেই মনে হয়েছে এক রাতের বেপরোয়া, অনিয়ন্ত্রিত আচরণ। কেউ কেউ এটিকে রাগের মাথায় করা একটি লজ্জাজনক ভুল বলে হালকা করে দেখতে চেয়েছেন। কিন্তু রাজনীতি খুব কম ক্ষেত্রেই এমন সরল হয়; বিশেষ করে যখন বিষয়টি ট্রাম্পের মতো একজন অভিজ্ঞ, বিতর্ক-নির্মাণে পারদর্শী রাজনীতিক ঘিরে। এ ভিডিওটি প্রকাশের সময়টিই আমাদের সতর্ক করে দেয়। এটি এসেছে কৃষ্ণাঙ্গ ইতিহাসচর্চার মাসে, এমন এক সময়ে- যখন যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণবাদ, নাগরিক অধিকার ও রাষ্ট্রীয় বৈষম্য নিয়ে বিতর্ক আবার তীব্র হয়ে উঠছে।
হোয়াইট হাউসের ব্যাখ্যা- কোনো নামহীন কর্মী, নাকি ট্রাম্পের সক্রিয় অ্যাকাউন্টে ওই পোস্ট দিয়েছে। রাজনৈতিক বাস্তবতায় খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না; বরং এই দায় এড়ানোর চেষ্টাই ইঙ্গিত দেয়, ঘটনাটি যতা হঠকারী বলে দেখানো হচ্ছে, আসলে ততা নয়। এই একটি পোস্টকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে বড় ছবিটি ধরা পড়ে না। এর ঠিক আগেই সশস্ত্র ফেডারেল এজেন্টদের হাতে নিরস্ত্র কৃষ্ণাঙ্গ সাংবাদিক ডন লেমন গ্রেফতার হয়েছেন। একই সময়ে ফিলাডেলফিয়ায় দাস প্রথা সংক্রান্ত একটি প্রদর্শনী সরিয়ে দিয়েছে ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিস। আবার জর্জিয়ায় ২০২০ সালের নির্বাচনের সেই সব ভোটকেন্দ্রের ব্যালট জব্দের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যেখানে ভোটারদের বড় অংশ কৃষ্ণাঙ্গ। এসব ঘটনা একে অপরের থেকে আলাদা নয়। এগুলো কোনো সূক্ষ্ম ইঙ্গিত বা কূটনৈতিক ভাষার আড়ালে লুকানো বৈষম্য নয়; প্রকাশ্য, দৃশ্যমান ও নির্লজ্জ বর্ণবাদী বাস্তবতা। কিন্তু এখানেই বিষয়টি শেষ নয়। এই বর্ণবাদী উসকানিগুলোর আরেকটি স্তর আছে; যা আরো গভীর, আরো রাজনৈতিক।
ট্রাম্পের রাজনীতি বরাবরই আক্রমণাত্মক। কিন্তু সেই আক্রমণ সব সময় আবেগের ফল নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রেই এটি ঠান্ডা মাথায় করা হিসাব। যখন কোনো প্রশ্ন তাকে কোণঠাসা করে ফেলতে পারে- অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি, ব্যর্থ প্রতিশ্রুতি বা আন্তর্জাতিক অচলাবস্থা-ঠিক তখনই তিনি ছুঁড়ে দেন আরো বড়, আরো চাঞ্চল্যকর এক বিতর্ক। ফলাফল একটাই- পুরোনো আলোচনাটি হারিয়ে যায় শোরগোলের ভিড়ে।
ওবামাদের নিয়ে সেই বর্ণবাদী পোস্ট এসেছে এমন এক সময়ে, যখন ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ইতিহাসের নিম্নস্তরে। মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে। ভেনেজুয়েলা নীতি অচল। গ্রিনল্যান্ড নিয়ে উচ্চাভিলাষী বক্তব্য হাস্যরসে পরিণত হয়েছে। এসব প্রশ্নের জবাব দেওয়ার বদলে ট্রাম্প বেছে নেন আরেকটি আগুন জ্বালাতে-যার তাপে আগের সব আলোচনাই ঝাপসা হয়ে যায়। এরপর সেই আগুনে ঘি ঢালা হয় আরো কিছু পদক্ষেপে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের কারাগারে পাঠানোর হুমকি, ফেডারেল রিজার্ভ প্রধান জেরোম পাওয়েল বা বিশেষ কৌঁসুলি জ্যাক স্মিথকে আক্রমণ, জাতীয় নির্বাচনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আহ্বান- সব মিলিয়ে বিতর্কের এমন এক ঘূর্ণাবর্ত তৈরি হয়; যেখানে কোনটি আসল সমস্যা আর কোনটি কৃত্রিম উত্তেজনা, তা আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ওই কৌশলের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো বিভ্রান্তি। প্রতিপক্ষ একের পর এক ইস্যুতে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে কোনো একটি বিষয়েই গভীর মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না। গণমাধ্যমও বাধ্য হয় প্রতিদিন নতুন আগুনের দিকে ছুটতে। ট্রাম্প সর্বক্ষণ আক্রমণে থাকেন, ফলে তাকে একটি নির্দিষ্ট ইস্যুতে জবাবদিহির মুখে দাঁড় করানো কঠিন হয়ে যায়। এখানেই তার সমালোচকেরা বারবার ভুল করেন। তারা ট্রাম্পকে শুধুই বেপরোয়া, অশালীন বা রাজনৈতিক শুদ্ধতার তোয়াক্কা না করা একজন ব্যক্তি হিসেবে দেখেন। অথচ এই ‘অশালীনতা’ই অনেক সময় তার সবচেয়ে কার্যকর রাজনৈতিক অস্ত্র। শত্রু তৈরি করে, ‘আমরা বনাম তারা’ বিভাজন জোরদার করে তিনি নিজের সমর্থকদের আরও সংহত করেন। এতে তার ব্যক্তিগত ক্ষতি হলেও রাজনৈতিক লাভের হিসাবটি তিনি ঠিকই কষে নেন। এই বিভ্রান্তির রাজনীতির সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো-এটি আমাদের সংবেদনশীলতাকে ভোঁতা করে দেয়। একের পর এক বিতর্ক, একের পর এক চরম বক্তব্যের ভিড়ে আমরা আর কোনো কিছুকেই যথেষ্ট গুরুত্ব দিতে পারি না। বর্ণবাদ, গণতন্ত্রের ক্ষয়, নাগরিক অধিকার লঙ্ঘন- সবই যেন এক সময় ‘আরেকটি খবর’ হয়ে যায়।
ওবামাদের নিয়ে সেই ভিডিও নিঃসন্দেহে ঘৃণ্য। কিন্তু প্রশ্ন শুধু এই ভিডিও ঘিরে নয়। আসল প্রশ্ন হলো-এ ধরনের শোরগোলের আড়ালে কী কী সত্য চাপা পড়ছে। যত দিন পর্যন্ত আমরা এই কৌশল বুঝতে না পারব, তত দিন আমরা প্রতিবারই নতুন কোনো উত্তেজনায় আলোচনার নিয়ন্ত্রণ হারাব। রাজনীতি কখনো শুধু বলা বা প্রকাশের মাত্রায় সীমাবদ্ধ থাকে না। রাজনৈতিক কার্যক্রম বিশ্লেষণ করতে গেলে আমাদের খতিয়ে দেখতে হয়- কী বলা হলো, কখন বলা হলো, কেন তা বলা হলো এবং এই বাক্য বা কর্মকাণ্ডের আড়ালে কী বাস্তব প্রভাব, কী চাপা পড়া প্রশ্ন এবং কোন নীতিগত দ্বন্দ্ব জন্ম নিচ্ছে। একটি রাজনৈতিক বক্তব্য বা পদক্ষেপ কেবল প্রচার বা শোরগোল তৈরি করাই নয়; বরং তা সমগ্র রাজনৈতিক পরিবেশকে নিয়ন্ত্রণ, প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত এবং সমর্থকদের মনকে একত্রিত করার সূক্ষ্ম কৌশল হিসেবে কাজ করে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রাথমিক দৃশ্যে হঠকারী বা আকস্মিক মনে হলেও বাস্তবে তা খুবই পরিকল্পিত কৌশল। এই কৌশলের মূল উদ্দেশ্য হলো গণমাধ্যম, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং জনমতকে এমনভাবে পরিচালনা করা যে তারা বিভ্রান্ত হয় এবং নির্ধারিত কৌশলের জালে আটকে যায়। যখন আমরা এসব কর্মকাণ্ডকে কেবল শব্দের বা শোরগোলের স্তরে বিচার করি, তখন প্রকৃত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়-যেমন নৈতিক দায়বদ্ধতা, গণতান্ত্রিক নীতি এবং রাজনৈতিক স্বচ্ছতা- ছাপিয়ে পড়ে বা চাপা যায়। এমন রাজনীতির প্রভাব কেবল যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সীমাতেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি বৈশ্বিক সতর্কবার্তা। কারণ যেখানে কৌশলগতভাবে সৃষ্ট উত্তেজনা এবং শোরগোলই শাসনের ভাষা হয়ে ওঠে, সেখানে নীরবভাবে ক্ষয়ে যায় গণতন্ত্রের ভিত্তি, দুর্বল হয় সামাজিক নিয়ন্ত্রণ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার, এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির কাঠামো ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।
ওই কৌশলগত বিভ্রান্তি শুধু রাজনৈতিক চক্রান্ত নয়, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক প্রতীকী সংকেত; যা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়- যদি রাজনৈতিক শোরগোলই কার্যকরতার প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তাহলে নীরবভাবে ক্ষয়ে যেতে পারে গণতান্ত্রিক মূলনীতি, দৃষ্টান্তমূলক ন্যায়বিচার এবং দায়িত্বশীল শাসন। তাই প্রশ্ন একটিই- আমরা এই সূক্ষ্ম ও কঠিন পাঠটি শিখতে প্রস্তুত, নাকি প্রতিবারই সাময়িক শোরগোলের তীব্রতায় বিমোহিত হয়ে মূল নীতিগত সত্যগুলোকে আড়ালে চলে যেতে দেব?
লেখক: আইনজীবী ও গবেষক
sarkerjahangiralam78@gmail.com
আজকের প্রত্যাশা/কেএমএএ