ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নতুন বাংলাদেশের পথে যাওয়ার মহাসুযোগ বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, দেশবাসী আর জুলাইয়ের মতো গণ-অভ্যুত্থান চায় না। তারা এমন একটি বাংলাদেশ চায়, যেখানে জনগণকে আর কখনো রাস্তায় নামতে হবে না।
দেশ নিয়ে নিজেদের পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করে শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াত সরকার গঠনের সুযোগ পেলে প্রথম দিনে ফজরের নামাজ পড়েই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন শুরু করা হবে।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে জামায়াতের আমির এ কথা বলেন। ভাষণের শুরুতে তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন এবং আহত ব্যক্তিদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন।
২০০৯ সালের পর দেশের সব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা হয়েছে দাবি করে জামায়াতের আমির বলেন, তথাকথিত নির্বাচনপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে জনগণকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, আয়নাঘর সৃষ্টি করা হয়েছে। এসব নিপীড়ন থেকে মুক্তি পেতেই রক্তাক্ত জুলাই এসেছিল। তরুণেরা এখন একটা নতুন দেশ দেখতে চায়, যে দেশকে তারা গর্ব করে বলতে পারবে নতুন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ২.০।
দেশের মানুষ পরিবর্তন চাইলেও একটি মহল সেই পরিবর্তনের বিরোধিতা করছে উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, তাদের বিরোধিতার কারণ, পরিবর্তন হলেই তাদের অপকর্মের পথ বন্ধ হবে, মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়ার সুযোগ থাকবে না। তরুণ প্রজন্মই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রচনা করবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাহসী ও মেধাবী তরুণদের হাতেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব তুলে দিতে হবে।
ঐক্যের বাংলাদেশ: জামায়াত প্রচলিত ধারা বদলাতে চায় উল্লেখ করে দলটির আমির বলেন, জামায়াত সবাইকে নিয়ে ঐক্যের বাংলাদেশ গড়তে চায়। এমন বাংলাদেশ, যেখানে কেবল পারিবারিক পরিচয়ে কেউ দেশের চালকের আসনে বসতে পারবে না। এমন বাংলাদেশ, যেখানে রাষ্ট্র হবে সবার, সরকার হবে জনগণের।
ভাষণে জামায়াত আমির দুর্নীতি, পরিবারতন্ত্র ও স্বজনপ্রীতির সমালোচনা করেন। তিনি দাবি করেন, অতীতে জামায়াতের জনপ্রতিনিধিরা কখনো দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত হননি।
রাষ্ট্র সংস্কার প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, জুলাই-পরবর্তী সময়ে কিছু সংস্কার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। তবে এসব পরিকল্পনার সব যেমন বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি, তেমনি অনেকগুলো একদমই প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। এসব সংস্কার নিশ্চিত করতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটের আয়োজন করা হচ্ছে। সে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে নতুন বাংলাদেশের পথে যাওয়ার একটি মহাসুযোগ উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘যেসব সমস্যা আমরা বিগত দিনে সমাধান করতে পারিনি, যে লুটেরা গোষ্ঠীকে আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি, সেসব সমস্যার সমাধান এবং লুটেরা গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণের সুযোগ হচ্ছে আগামী নির্বাচন। তাই জনগণকে ঠিক করতে হবে—আমরা আমাদের নিজেদের জন্য, আমাদের তরুণদের জন্য, আমাদের নারীদের জন্য, বয়স্ক মানুষের জন্য, প্রান্তিক মানুষের জন্য, শ্রমিকের জন্য, উদ্যোক্তাদের জন্য কোন বাংলাদেশ চাই।’
এ সময় জামায়াতের আমির সততা, ঐক্য, ইনসাফ, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানে ‘হ্যাঁ’ এবং দুর্নীতি, ফ্যাসিবাদ, আধিপত্যবাদ, বেকারত্ব ও চাঁদাবাজিকে ‘না’ বলার আহ্বান জানান।
নারীর মর্যাদা রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে জামায়াতের আমির বলেন, জামায়াত ক্ষমতায় এলে নারীরা কেবল ঘরের ভেতরে নন, সমাজের মূলধারার নেতৃত্বে থাকবেন সগৌরব। করপোরেট জগৎ থেকে রাজনীতি—সবখানে তাঁদের মেধার মূল্যায়ন হবে কোনো বৈষম্য ছাড়াই। জামায়াত এমন এক দেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, যেখানে কোনো মা-বোনকে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হবে না।
সংখ্যালঘু অধিকার, নৈতিক ও প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষা, বিচার বিভাগের সংস্কার এবং বিনিয়োগবান্ধব অর্থনীতির প্রতিশ্রুতি দেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, বাংলাদেশ হবে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান—সবার দেশ। কেউ ভয়ের সংস্কৃতিতে বসবাস করবে না। যদি কেউ ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে আঘাত করার চেষ্টা করে, অতীতের মতো ভবিষ্যতেও তা প্রতিরোধ করা হবে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সমমর্যাদার ভিত্তিতে বৈশ্বিক সম্পর্ক গড়ে তোলা হবে। জলবায়ু পরিবর্তন নিরসনে সাধ্যমতো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা হবে।
জামায়াত প্রবাসীদের অধিকার ও মর্যাদা রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিত করতে চায় উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াত ক্ষমতায় যেতে পারলে প্রবাসীদের জন্য ‘ভলান্টিয়ার প্রতিনিধি’ নির্বাচন করা হবে, যারা প্রবাসীদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা, সেবা ও সমস্যার বিষয়ে দূতাবাস বা হাইকমিশনের সঙ্গে সরাসরি সমন্বয় করবে। তারা প্রবাসীদের স্বার্থে উপদেষ্টা ও প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করবে। প্রবাসীরাও যেন সংসদে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, সে জন্য আনুপাতিক হারে সংসদে প্রবাসী প্রতিনিধি নির্বাচন বা মনোনয়নের বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবে জামায়াত।
ভাষণে সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে সব দলের প্রতি আচরণবিধি মেনে চলার আহ্বান জানান জামায়াত আমির। তিনি ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দেওয়ার আবেদন জানান। একই সঙ্গে যেসব অঞ্চলে ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী আছেন, সেসব এলাকায় তাঁদের দলীয় প্রতীকে ভোট দেওয়ারও আহ্বান জানান জামায়াতের আমির।
সানা/আপ্র/১০/২/২০২৬