বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে বহু বছর ধরে কথা বলা হলেও বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। যদিও দেশটি কয়েক দশক ধরে শাসন করেছেন এসেছেন দুই নারী নেত্রী। তবে সাম্প্রতিক সময়ে নারীদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, সামাজিক অবমাননা এবং রাজনৈতিক পরিসরে নিরাপত্তাহীনতার ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। একদিকে নারীর ক্ষমতায়ন ও অংশগ্রহণের কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে সেই নারীকেই হেয় করা হচ্ছে রাজনৈতিক বক্তব্য ও আচরণের মাধ্যমে। এই দ্বৈততা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য অশনিসংকেত। রাজনৈতিক দলগুলোকেই নারীদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে হবে-বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমানের এই বক্তব্য সময়োপযোগী ও তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি সঠিকভাবেই তুলে ধরেছেন, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হলে ধারাবাহিক রাজনৈতিক ‘পাইপলাইন’ তৈরি করতে হবে। ছাত্র রাজনীতি থেকে শুরু করে স্থানীয় সরকার পর্যন্ত নারীদের জন্য সমান সুযোগ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত না করা গেলে দক্ষ ও যোগ্য নারী নেতৃত্ব তৈরি সম্ভব নয়।
বাস্তবতা হলো, রাজনীতিতে অর্থনৈতিক বৈষম্য, সাংগঠনিক সহায়তার অভাব এবং নিরাপত্তাহীনতা-এই তিনটি বড় বাধা নারীদের এগিয়ে আসার পথে বারবার দেয়াল তুলে দিচ্ছে। পুরুষদের জন্য যে সুযোগ-সুবিধা স্বাভাবিকভাবে বিদ্যমান, নারীদের ক্ষেত্রে তা প্রায়ই অনুপস্থিত। ফলে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে আরও গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করেছে নারীদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিদ্বেষমূলক বক্তব্য। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের বিরুদ্ধে কর্মজীবী নারীদের নিয়ে ‘অবমাননাকর ও নারীবিদ্বেষী’ বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে ১১টি সংগঠনের নির্বাচন কমিশনে স্মারকলিপি প্রদান পরিস্থিতির গভীরতাই তুলে ধরে। স্মারকলিপিতে উত্থাপিত অভিযোগ শুধু একটি বক্তব্যের বিরোধিতা নয়; এটি নারীর শ্রম, মর্যাদা ও সাংবিধানিক অধিকারের পক্ষে একটি স্পষ্ট অবস্থান।
গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন খাতে কর্মরত নারীরা যুগ যুগ ধরে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছেন। সেই নারীদের অবদানকে অবমূল্যায়ন করে দেওয়া বক্তব্য শুধু নারীর প্রতি ঘৃণাই উসকে দেয় না, বরং সহিংসতা ও বৈষম্যের সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করে। নির্বাচনের সময় নারীদের ওপর হামলা ও হয়রানির অতীত ইতিহাস বিবেচনায় নিলে এ ধরনের বক্তব্য আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক দল, নির্বাচন কমিশন এবং রাষ্ট্র-এই তিন পক্ষেরই এখানে সুস্পষ্ট দায় রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের নেতাকর্মীদের বক্তব্য ও আচরণের দায় নিতে হবে। নির্বাচন কমিশনকে আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। আর রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে-নারী যেন কেবল ভোটার হিসেবেই নয়, একজন পূর্ণ নাগরিক হিসেবে নিরাপদ ও সম্মানজনকভাবে রাজনৈতিক পরিসরে অংশ নিতে পারেন। নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা কোনো পক্ষের অনুগ্রহ নয়; এটি সাংবিধানিক অধিকার। এই অধিকার রক্ষায় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। অন্যথায় গণতন্ত্রের কথা বললেও তা ফাঁপা স্লোগান হয়েই থেকে যাবে।
সানা/আপ্র/১০/২/২০২৬