বাংলাদেশ আবারো এক সন্ধিক্ষণে। দীর্ঘ দেড় বছরের অনির্বাচিত পর্ব ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা পেরিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের মাধ্যমে দেশ নতুন এক গণতান্ত্রিক অধ্যায়ে প্রবেশের প্রত্যাশায়। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত টানা ভোটগ্রহণ, ২৯৯টি আসনে ৪২ হাজার ৭৭৯টি কেন্দ্রে প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটারের অংশগ্রহণ-সংখ্যার বিচারে এটি এক বিশাল আয়োজন। নিরাপত্তায় সাত বাহিনী, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-সব মিলিয়ে প্রস্তুতির ঘাটতি ছিল না।
তবু প্রশ্নের জায়গাও রয়ে গেছে। ভোটের আগের দিন বিকেল ও সন্ধ্যায় কিছু কেন্দ্রে ব্যালটে সিল মারার অভিযোগের ছবি ও ভিডিও সামাজিক ও সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ ধরনের দৃশ্য স্বাভাবিকভাবেই সুষ্ঠু ভোট নিয়ে সংশয় তৈরি করে। নির্বাচন কমিশন ও সরকার প্রধানেরা ভোটের দিনে সন্তোষ প্রকাশ করলেও গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি নির্ভর করে কেবল ঘোষণায় নয়, মানুষের আস্থায়। সেই আস্থার ভিত্তি হলো স্বচ্ছতা, সমতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার ন্যায্যতা।
এই নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি ও জামায়াত। তবে একটি বড় ঐতিহাসিক দলের অনুপস্থিতি ভোটের অন্তর্ভুক্তি ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। গণতন্ত্রে অংশগ্রহণ যত বিস্তৃত হয়, ফলাফল ততই শক্ত ভিত্তি পায়। অন্যদিকে তরুণ ভোটারদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি-৩৫ বছরের নিচে প্রায় ৪ কোটি ৯০ লাখ-ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তাদের প্রত্যাশা কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়; তারা চায় স্বচ্ছ প্রক্রিয়া, জবাবদিহি ও ন্যায়সঙ্গত রাষ্ট্রচর্চা।
নির্বাচন ঘিরে ‘টাকার রাজনীতি’ও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন জেলায় নগদ অর্থ জব্দ, ভোট কেনার অভিযোগ, পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর নজরদারি প্রমাণ করে-ভোট কেবল রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক শক্তিরও লড়াই। নির্বাচন কমিশন বলেছে, অর্থের উৎস বৈধ হলে বহনে বাধা নেই; কিন্তু ভোটে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাস্তবে এই সীমারেখা কতটা কার্যকরভাবে রক্ষা করা যায়, সেটিই বড় প্রশ্ন।
স্বস্তির দিক হলো, সামগ্রিকভাবে ভোটের পরিবেশ ছিল উৎসবমুখর এবং বড় ধরনের সহিংসতা দেখা যায়নি। তবে সংখ্যালঘু ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে যে উদ্বেগ রয়েছে, তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। গণতন্ত্রের সাফল্য মাপা হয় দুর্বল ও সংখ্যালঘু নাগরিকের নিরাপত্তায়। ফল যা-ই হোক, প্রকৃত পরীক্ষা শুরু হবে ফল ঘোষণার পর। বিজয়ীদের সংযম ও পরাজিতদের দায়িত্বশীলতা-উভয়ই জরুরি। অভিযোগ থাকলে সাংবিধানিক পথেই সমাধান চাইতে হবে। জনগণের রায়কে অস্বীকার করে উত্তেজনা ছড়ানো কিংবা রাষ্ট্রযন্ত্রকে দলীয় সম্পদ মনে করা-উভয়ই গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস সংগ্রামের; গণতন্ত্রের পথও সহজ ছিল না। এবার অন্তত এমন এক দৃষ্টান্ত স্থাপিত হোক, যেখানে জয়-পরাজয়ের ঊর্ধ্বে থেকে প্রতিষ্ঠিত হবে আস্থা, সংলাপ ও সহনশীলতার সংস্কৃতি। দল জিততে বা হারতে পারে-কিন্তু গণতন্ত্র যেন পরাজিত না হয়। সেই প্রত্যাশাই এবারের ব্যালটের সবচেয়ে বড় অর্থ।
সানা/আপ্র/১৩/২/২০২৬