দীর্ঘ স্বৈরশাসনের অবসান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল দিন পেরিয়ে অবশেষে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আবারও তার গণতান্ত্রিক যাত্রাপথে প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা দিলো। এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়; এটি একাত্তরের রক্তস্নাত ইতিহাসের প্রতি নতুন করে অঙ্গীকার উচ্চারণ, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রতি জাতির শ্রদ্ধার পুনঃপ্রতিষ্ঠা।
স্বাধীনতার চেতনা আমাদের জাতীয় জীবনের ভিত্তি। সেই চেতনার কেন্দ্রে রয়েছে মুক্তচিন্তা, মানবিক মর্যাদা, আইনের শাসন এবং জনগণের অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র। সাম্প্রতিক নির্বাচনে জনগণ তাদের সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগ করে যে রায় দিয়েছেন, তা শুধু একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সমাপ্তি নয়-বরং একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা। এই রায়কে আমরা দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, রাষ্ট্র ও জাতির সামগ্রিক অগ্রযাত্রার প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করতে চাই।
নির্বাচনের ফলাফল স্পষ্ট করেছে যে জনগণ স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন, ন্যায়বিচার ও অংশীদারিত্বমূলক শাসনব্যবস্থা প্রত্যাশা করে। এখন দায়িত্ব নতুন সরকারের-তারা যেন নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে আন্তরিক ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়। অর্থনৈতিক সুশাসন, দুর্নীতি দমন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে গুণগত উন্নয়ন এবং মানবাধিকার সুরক্ষা-এসব ক্ষেত্রে বাস্তব অগ্রগতি সময়ের দাবি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একটি বিভাজনহীন সমাজ-রাষ্ট্র নির্মাণ। মত ও পথের ভিন্নতা গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য; কিন্তু সেই ভিন্নতা যেন বিদ্বেষ বা প্রতিহিংসার কারণ না হয়। দেশ ও স্বাধীনতাপ্রেমে উজ্জীবিত, অসাম্প্রদায়িক ও সম্প্রীতিপূর্ণ সমাজ গড়াই হওয়া উচিত আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার। ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি বা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিন্নতা সত্ত্বেও আমরা সবাই এই রাষ্ট্রের সমান অধিকারভুক্ত নাগরিক-এই বোধকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তন মানেই প্রতিপক্ষের অবমূল্যায়ন নয়; বরং গণতন্ত্রে শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল বিরোধী মতও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাই নতুন সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা-সংলাপ, সহনশীলতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনের মাধ্যমে তারা এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলবে, যেখানে আস্থা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা হবে প্রধান ভিত্তি।
স্বাধীনতার আত্মত্যাগ আমাদের শিখিয়েছে-এই দেশ কারও একার নয়, সবার। সেই চেতনায় অনুপ্রাণিত হয়ে আমরা আশা করি, নতুন সরকার তাদের নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী কাজ করবে এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক, সম্প্রীতিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
জুলাই-পরবর্তী সময়টি ছিল অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তায় পরিপূর্ণ। এ সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার ইতিহাস এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি অসম্মানজনক আচরণ জাতির বৃহদাংশকে ব্যথিত করেছে; হতাশ করেছে; লজ্জিত করেছে। কিছু ঐতিহাসিক স্থাপনা, স্মারক ও স্মৃতিস্তম্ভ ভাঙচুর বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাও আলোচনা-সমালোচনায় আসে। শিল্প-সংস্কৃতির পরিমণ্ডলেও অস্থিরতা দেখা দেয়; উগ্রতা ও ‘মব সংস্কৃতি’র বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন অনেকেই। ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্থাপনায় হামলার ঘটনাও জনমনে প্রশ্নের জন্ম দেয়। আক্রান্ত হয় সংবাদমাধ্যমও।
সমালোচকরা মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকার এসব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি। স্বাধীনতাযুদ্ধে বিরোধিতার ইতিহাস রয়েছে-এমন রাজনৈতিক শক্তির পুনরুত্থান এবং এই নির্বাচনে তাদের উল্লেখযোগ্য প্রভাববিস্তার ছিল আলোচনার কেন্দ্রে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, জুলাই-পরবর্তী পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় নতুন রাজনৈতিক জোট ও সমীকরণ গড়ে ওঠে, যা নির্বাচনী ফলাফলে প্রতিফলিত হয়েছে। আমরা আশা করি-জনরায়ের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে জোটটি বাংলাদেশের মূলধারার রাজনীতিকে সুস্থ-শক্তিশালী ও গতিশীল করবে।
সর্বোপরি, এই নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করেছে-স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ইতিহাসের প্রতি সম্মান কোনো ক্ষণিক আবেগের বিষয় নয়; এটি জাতির স্থায়ী চেতনা। ১৯৭১-এর মূল্যবোধকে অস্বীকার করে কোনো ভবিষ্যৎ নির্মাণ সম্ভব নয়-এ উপলব্ধি ভোটের মাধ্যমে পুনরায় উচ্চারিত হয়েছে বলেই অনেকে মনে করেন। ইতিহাস তার নিজস্ব মর্যাদায় অটুট থাকে; জনগণের রায় সেই ধারাবাহিকতাকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। জুলাই অভ্যুত্থানের পর স্বাধীনতার চেতনা, মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মারক, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান-সবই নানা আঘাতের মুখে পড়েছিল। ধানমন্ডির ঐতিহাসিক ৩২ নম্বর বাড়ি, স্মৃতিস্তম্ভ, মাজার, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য-উগ্রতার আগ্রাসনে ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল আমাদের আত্মপরিচয়। মব সংস্কৃতির বিস্তার জাতিকে লজ্জিত করেছিল। সেই প্রেক্ষাপটে এই নির্বাচন যেন এক নীরব প্রত্যুত্তর-১৯৭১ কে অস্বীকার করে ২০২৪ গড়া যায় না। বরং, ৭১কে অবমাননা মানে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে জ¦লে ওঠা ২৪কেও প্রকারান্তরে অস্বীকার করা-অসম্মান করা। ইতিহাস ছিঁড়ে ফেলা যায় না; তাকে অস্বীকার করলে সে আরো দীপ্ত হয়ে ফিরে আসে।
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬-এর ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে কেবল কোনো এক দলের বিজয় বা পরাজয় হিসেবে দেখার চেয়ে বৃহত্তর অর্থে রাষ্ট্র ও স্বাধীনতার আদর্শের প্রতি জনগণের অঙ্গীকার হিসেবে বিবেচনা করাই অধিক যুক্তিসঙ্গত। বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে একটি সহনশীল, অসাম্প্রদায়িক ও সম্প্রীতিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়াই এখন সময়ের প্রধান দাবি।
সানা/আপ্র/১৩/২/২০২৬