স্টেডিয়ামের সবার দৃষ্টি তখন বড় পর্দায়। সেখানে ‘আউট’ ভেসে উঠতেই মাঠে হুঙ্কার ছুড়ে উদযাপনে মেতে উঠলেন জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটাররা। পায়ে টান লাগায় মাঠ ছেড়ে সিকান্দার রাজা ছিলেন ডাগআউটে। মাঠের বাইরের উদযাপনের মধ্যমণি হয়ে উঠলেন অধিনায়ক। গ্যালারিতেও চলতে থাকল উল্লাস।
এমন উপলক্ষ তো খুব আসে না জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটে! এবারের বিশ্বকাপের প্রথম সত্যিকারের অঘটনের জন্ম দিল জিম্বাবুয়ে। কার্যকর ব্যাটিংয়ের পর দুর্দান্ত বোলিং আর ফিল্ডিংয়ের প্রদর্শনীতে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে দিল তারা ২৩ রানে। অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে খেলার সুযোগই তাদের আসে কদাচিৎ। সেই প্রথম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে কুলীন এই দেশটিতে হারিয়েছিল তারা। পরের এই প্রায় ১৯ বছরে এই সংস্করণে তাদের তৃতীয় সাক্ষাৎ এটি। জিম্বাবুয়ে ফিরিয়ে আনল সেই বিশ্বকাপের স্মৃতি।
কলম্বোর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে শুক্রবার ২০ ওভারে জিম্বাবুয়ে তোলে ১৬৯ রান। এই সময়ের ক্রিকেটে রানটাকে কমই বলতে হয়। বিশেষ করে উইকেটের পতন যখন স্রেফ দুটি।
তবে মাঝবিরতিতে জিম্বাবুয়ের অলরাউন্ডার রায়ান বার্ল বললেন, “উইকেট দেখে আমাদের মনে হয়েছে, এটি ১৭০ রানের মতোই উইকেট। আশা করি আমরা পারব।” সেই কথাই পরে সত্যি প্রমাণ করলেন তারা। অস্ট্রেলিয়া গুটিয়ে গেল ১৪৬ রানেই। প্রথম ম্যাচে ওমানকে হারানো জিম্বাবুয়ে পেল টানা দ্বিতীয় জয়। আগের ম্যাচের নায়ক ব্লেসিং মুজারাবানি আবারও পেলেন ম্যাচ-সেরার পুরস্কার। দীর্ঘদেহী পেসার ক্যারিয়ারে প্রথমবার পেলেন ম্যাচে ৪ উইকেটের স্বাদ।
এই সংস্করণে ১০০ উইকেটও পূর্ণ করেন তিনি এ দিন। জয়ের আরেক নায়ক ব্র্যাড ইভান্স। আগের ম্যাচের মতো এ দিনই ৩ উইকেট নেন এই পেসার। চোটজর্জর দল নিয়ে বিশ্বকাপে আসা অস্ট্রেলিয়া এই ম্যাচেও পায়নি অধিনায়ক মিচেল মার্শকে।
তবে জিম্বাবুয়ের জয়কে তাতে খাটো করার জো নেই। তাদের অবস্থাও যে তথৈবচ! ম্যাচের আগে চোটের কারণে হারায় তারা অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান ব্রেন্ডন টেইলরকে। হালকা চোটের কারণে এ দিন খেলতে পারেননি পেসার রিচার্ড এনগারাভা। পায়ে টানা লাগায় ফিল্ডিং ইনিংসের অষ্টম ওভারের পর মাঠ ছেড়ে যান অধিনায়ক রাজা।
প্রেমাদাসার উইকেট বরাবরের মতোই ছিল একটু শুষ্ক ও মন্থর। টস হেরে ব্যাটিংয়ে নামা জিম্বাবুয়ে ভালো শুরু এনে দেন ব্রায়ান বেনেট ও টাডিওয়ানাশে মারুমানি। পাওয়ার প্লেতে ৪৭ রান তোলেন দুজন। এমনিতে বেনেট বেশি আগ্রাসী হলেও এ দিন মারুমানিই ছিলেন তুলনামূলক বেশ অগ্রণী।
আগে বিদায় নেন তিনিই। ৭ চারে ২১ বলে ৩৫ রান করে মার্কাস স্টয়নিসের শিকার হন তিনি। উদ্বোধনী জুটি থামে ৬১ রানে। জিম্বাবুয়ে এরপর চমক দেয় ব্যাটিং অর্ডারে। ‘ফিনিশার’ রায়ান বার্লকে নামিয়ে দেয় তারা তিন নম্বরে। এই পদক্ষেপও কাজে লেগে যায়। বেনেট ও বার্ল দ্বিতীয় উইকেটে গড়েন ৭০ রানের জুটি। ৩০ বলে ৩৫ করে বার্ল আউট হন ষোড়শ ওভারের শেষ বলে। পরের চার ওভারে রানের গতি বাড়িয়ে দলকে ১৬৯ রানে নিয়ে যান বেনেট ও রাজা।
১৩ বলে ২৫ রানে অপরাজিত থাকেন রাজা। ইনিংস শুরু করতে নেমে বেনেট শেষ পর্যন্ত অপরাজিত থাকেন ৫৬ বলে ৬৪ রান করে। টি-টোয়েন্টিতে মোটেও আদর্শ ইনিংস এটি নয়। তবে এ দিন সেটিই কার্যকর প্রমাণ করেন তাদের বোলাররা।
প্রথম ওভারে রাজার বলে ট্রাভিস হেডের বাউন্ডারি আর জশ ইংলিসের ছক্কায় শুরু হয় অস্ট্রেলিয়ার রান তাড়া। দ্বিতীয় ওভারে আক্রমণে এসে প্রথম বলেই ইংলিসকে ফেরান মুজারাবানি। পরের ওভারে ইভান্সের বলে বাজে শটে উইকেট হারান ক্যামেরন গ্রিন। প্রতি ওভারে উইকেট পতনের ধারা চলতে থাকে। মুজারাবানির বলে আলগা শটে বিদায় নেন চোট কাটিয়ে ফেরা টিম ডেভিড। ইভান্সের বল হেডের (১৫ বলে ১৭) ব্যাটে লেগে পায়ে ছোবল দিয়ে গড়িয়ে আঘাত করে স্টাম্পে।
৫ ওভারে ৪ উইকেট হারিয়ে তখন কাঁপছে অস্ট্রেলিয়া। সহজাত খেলা দমিয়ে তখন উইকেট ধরে রাখায় মনোযোগ দেন গ্লেন ম্যাক্সওয়েল। ম্যাট রেনশ অবশ্য কিছুটা ইতিবাচক গতিতে এগোতে থাকেন। দুজনের জুটি গড়ে ওঠে বটে, তবে প্রয়োজনীয় রান রেটও বাড়তে থাকে ক্রমে। ৭৭ রানের জুটিতে বল লাগে ৫৯টি। রানের সেই দাবি যখন মেটানোর কথা, ম্যাক্সওয়েল বিদায় নেন তখনই।
রাজা বাইরে চলে যাওয়ায় একটি ওভার পুষিয়ে দিতে আক্রমণে এসে বার্ল ধরে ফেলেন বড় শিকার। বড় শটের চেষ্টায় বল স্টাম্পে টেনে আনেন ম্যাক্সওয়েল (৩১ বলে ৩১)। পরের ওভারে মার্কাস স্টয়নিসের বিদায়ে অস্ট্রেলিয়ায় হার অনেকটাই নিশ্চিত হয়ে যায়।
রেনশ অবশ্য চেষ্টা করে যান। পঞ্চম টি-টোয়েন্টি খেলতে নামা ব্যাটসম্যান প্রথম ফিফটির স্বাদ পান ৩৪ বলে। তবে রান রেটের ক্রমবর্ধমান দাবি মেটাতে পারেননি তিনিও (৪৪ বলে ৬৫)। শেষ দিকে টনি মুনিয়োঙ্গার অসাধারণ ক্যাচে ফেরেন বেন ডোয়ার্শিস।
একটু পরই ম্যাচ শেষ করে উল্লাসে মেতে ওঠে জিম্বাবুয়ে। চোটের কারণে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়া ব্রেন্ডন টেইলর ছিলেন ডাগআউটে। ২০০৭ বিশ্বকাপে জয়ের ম্যাচে তিনি ছিলেন ম্যাচ-সেরা। এবারও দেশে ফেরার আগে দারুণ এক সুখস্মৃতি সঙ্গী হলো তার। জিম্বাবুয়ের সামনে এখন সুপার এইটের হাতছানি। পরের দুই ম্যাচে তাদের প্রতিপক্ষ শ্রীলঙ্কা ও আয়ারল্যান্ড।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
জিম্বাবুয়ে : ২০ ওভারে ১৬৯/২ (বেনেট ৬৪, মারুমানি ৩৫, বার্ল ৩৫, রাজা ২৫*; ডোয়ার্শিস ৪-০-৪০-০, স্টয়নিস ২.৫-০-১৭-১, ম্যাক্সওয়েল ১-০-১৪-০, কুনেমান ৩-০-২৪-০, এলিস ৪-০-৩৪-০, জ্যাম্পা ৪-০-৩১-০, গ্রিন ১.১-০-৬-১)।
অস্ট্রেলিয়া : ১৯.৩ ওভারে ১৪৬ (ইংলিস ৮, হেড ১৭, গ্রিন ০, ডেভিড ০, ম্যাক্সওয়েল ৩১, রেনশ ৬৫, স্টয়নিস ৬, ডোয়ার্শিস ৬, এলিস ৭*, জ্যাম্পা ২, কুনেমান ০; রাজা ২-০-১৭-০, মুজারাবানি ৪-০-১৭-৪, ইভান্স ৩.৩-০-২৩-৩, মায়ার্স ১-০-৯-০, ক্রিমার ,৪-০-৩৩-০ মাসাকাদজা ৪-০-৩৬-১, বার্ল ১-০-৯-১)।
ফল: জিম্বাবুয়ে ২৩ রানে জয়ী।
ম্যান অব দা ম্যাচ: ব্লেসিং মুজারাবানি।
ডিসি/আপ্র/১৩/০২/২০২৬