দীর্ঘ স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়ে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সূচনা করেছিল, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সেই ধারাবাহিকতাকেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটে নানা সংশয় ও অন্তর্ভুক্তি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও সার্বিকভাবে শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে জনগণ তাদের রায় প্রকাশ করেছে। এই রায় কেবল একটি দলের বিজয় নয়; এটি গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
বেসরকারি ফলাফলে ২৯৭টি ঘোষিত আসনের মধ্যে ২০৯টিতে জয় পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দুই দশক পর রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন দলটির জন্য যেমন ঐতিহাসিক, তেমনি দেশের জন্যও তা এক নতুন প্রত্যাশার সূচনা। বিজয়ের পর সংবাদ সম্মেলনে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান যে বার্তা দিয়েছেন-‘এ বিজয় গণতন্ত্রের, এ বিজয় বাংলাদেশের’-তা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষসহ সমগ্র জাতির প্রতি অন্তর্ভুক্তিমূলক আহ্বান হিসেবেই বিবেচিত হওয়া উচিত। শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা, প্রতিশোধপরায়ণতা পরিহার এবং আইনের সমান প্রয়োগের অঙ্গীকার নতুন সরকারের জন্য ইতিবাচক সূচক।
গুরুত্বপূর্ণ হলো, সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাওয়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ফলাফল মেনে নিয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকার ঘোষণা দিয়েছে। গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য নির্ভর করে কার্যকর বিরোধী দলের ওপর; সরকার ও বিরোধী দল পরস্পরের প্রতিপক্ষ হলেও রাষ্ট্রের প্রশ্নে তারা সহযাত্রী। এ বাস্তবতা অনুধাবন করে উভয়পক্ষের সংযম ও প্রাতিষ্ঠানিক আচরণই গণতন্ত্রকে সুস্থ ধারায় প্রবাহিত করতে পারে।
তবে রাজনৈতিক উত্তরণের উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি বাস্তবতার কঠিন চ্যালেঞ্জও অনস্বীকার্য। ভঙ্গুর অর্থনীতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা, কর্মসংস্থানের চাপ, দুর্বল আইনশৃঙ্খলা ও প্রাতিষ্ঠানিক আস্থাহীনতা-সবমিলে নতুন সরকারের সামনে রয়েছে জটিল এক কর্মপরিকল্পনা। জনগণের প্রত্যাশা এখন কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়; সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার দৃশ্যমান প্রয়োগ। নির্বাচনী ইশতেহার, ৩১ দফা কিংবা রাষ্ট্র মেরামতের প্রতিশ্রুতি-এসবের বাস্তবায়নই হবে আস্থার প্রকৃত পরীক্ষা।
নির্বাচনে ৫০টি দলের অংশগ্রহণ, প্রায় দুই হাজার প্রার্থী এবং উল্লেখযোগ্য ভোটার উপস্থিতি গণতান্ত্রিক চর্চার ইতিবাচক দিক। একই সঙ্গে নারী প্রতিনিধিত্ব ও তরুণদের প্রত্যাশাও গুরুত্বের দাবি রাখে। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে নাগরিক সমাজ আরো সচেতন; তারা নীতি ও কর্মের সামঞ্জস্য দেখতে চায়।
এ মুহূর্তে সবচেয়ে প্রয়োজন জাতীয় ঐক্যের সংস্কৃতি। বিভক্তির রাজনীতি অতীতে যে ক্ষত সৃষ্টি করেছে, তা থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন সরকারকে হতে হবে উদার, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, প্রতিষ্ঠানসমূহের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা-এসবই গণতন্ত্রের মূলভিত্তি।
গণরায় নতুন যাত্রার দ্বার খুলেছে। এখন দায়িত্ব ক্ষমতাসীনদের-প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবতার সেতুবন্ধন গড়ে একটি জবাবদিহিমূলক, মানবিক ও উন্নয়নমুখী বাংলাদেশ নির্মাণ করা। আমাদের প্রত্যাশা একটাই-সুশাসনের অবিচল চর্চা, যেখানে বিজয় হবে দেশের, অর্জন হবে সবার।
সানা/আপ্র/১৫/২/২০২৬