রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু মুহূর্ত থাকে, যেগুলো কেবল ক্ষমতার পালাবদলের কারণে নয়, বরং রাজনৈতিক আচরণের পরিবর্তনের জন্য স্মরণীয় হয়ে ওঠে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি তেমনই এক সন্ধিক্ষণ।
বহু বছর পর আমরা লক্ষ্য করছি সংযম, সৌজন্য ও দায়িত্বশীলতার এক প্রত্যাশিত প্রকাশ। ফলাফল মেনে নিয়ে দায়িত্বশীল বিরোধীদল হিসেবে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছেন জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দল হতে যাওয়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। অন্যদিকে ঐতিহাসিক বিজয়ের পর বিরোধী নেতাদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের উদ্যোগ নিয়েছেন তারেক রহমান। নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর রাখতে ভূমিকার জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। এসব পদক্ষেপ একত্রে ইঙ্গিত দিচ্ছে-গণতন্ত্র কেবল প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র নয়, এটি সহাবস্থানেরও শিল্প।
গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রদর্শনে নয়; বরং ভিন্নমতের প্রতি সম্মান প্রদর্শনে। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে পরাজিত পক্ষের হতাশা স্বাভাবিক, কিন্তু সেই হতাশাকে শৃঙ্খলায় রূপ দেওয়া রাজনৈতিক পরিপক্বতার লক্ষণ। জনগণের রায়কে স্বীকৃতি দেওয়া মানে কেবল সাংবিধানিক আনুগত্য নয়; এটি রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা ও স্থিতিশীলতার প্রতি অঙ্গীকার। বিরোধীদল হিসেবে সংসদে উপস্থিতি বৃদ্ধি পাওয়ার অর্থও তাই কেবল রাজনৈতিক সাফল্য নয়, বরং দায়িত্বের পরিসর সম্প্রসারণ। সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, বিকল্প নীতি উপস্থাপন করা এবং গণস্বার্থে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া-এসবই হবে একটি কার্যকর বিরোধীদলের প্রধান কাজ।
বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী দলের জন্যও এ সময়টা আত্মসমালোচনা ও আত্মসংযমের। গণরায় কোনো উন্মুক্ত লাইসেন্স নয়; এটি জনগণের আস্থার শর্তযুক্ত আমানত। এই আমানতের মূল শর্ত-আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অবসান এবং প্রতিটি নাগরিকের সমান নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ক্ষমতার আসনে বসেই যদি সংযম বিস্মৃত হয়, তবে গণতন্ত্র দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সংখ্যাগরিষ্ঠতার ঔদ্ধত্য যেমন ক্ষতিকর, তেমনি বিরোধিতার অন্ধ উগ্রতাও সমান বিপজ্জনক।
রাজনীতির ভাষা ও ভঙ্গি সমাজের মানসগঠনে গভীর প্রভাব ফেলে। নেতারা যদি সহিষ্ণুতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার উদাহরণ স্থাপন করেন, তবে সাধারণ মানুষও সংলাপ ও সহাবস্থানের শিক্ষা পায়। সংসদে তর্ক-বিতর্ক থাকবে-সেটিই স্বাভাবিক; কিন্তু তা যেন ব্যক্তিগত আক্রমণ, বিদ্বেষ বা সহিংসতায় পর্যবসিত না হয়। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য সংঘাতে নয়, সংঘাতকে নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতায়।
নির্বাচন-পরবর্তী সৌজন্য সাক্ষাৎ, টেলিফোন আলাপ ও পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময় নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এগুলো রাজনৈতিক সংস্কৃতির বার্তা বহন করে। এগুলো প্রমাণ করে, ভিন্ন আদর্শ ও অবস্থান সত্ত্বেও রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থে সংলাপের পথ খোলা রাখা সম্ভব। এই চর্চাই সুস্থধারার গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।
বাংলাদেশ আজ সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল দিগন্তে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘদিনের সংঘাতময় রাজনীতির অভিজ্ঞতা পেরিয়ে যদি আমরা দায়িত্বশীল সরকার, গঠনমূলক বিরোধী দল এবং সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে পারি, তবে তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক শক্ত ভিত্তি নির্মাণ করবে। সহনশীলতার এই নবপ্রভাত যেন ক্ষণস্থায়ী আলো না হয়ে স্থায়ী আলোকবর্তিকায় পরিণত হয়-এ প্রত্যাশাই আজ জাতির। গণতন্ত্রের এই পুনর্জাগরণকে ইতিহাসে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন প্রজ্ঞা, নৈতিক দৃঢ়তা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার অটল চর্চা।