গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

মেনু

ভূমির বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি: সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা

Super Admin

Super Admin

প্রকাশিত: ০১:৪৩ পিএম, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ০৩:০৩ এএম ২০২৬
ভূমির বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি: সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা
ছবি

প্রতিনিধিত্বকারী ছবি

ড. জাহাঙ্গীর আলম সরকার======
ভূমি ও সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধ বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থ’ার সবচেয়ে দীর্ঘস্থ’ায়ী, জটিল ও বহুমাত্রিক সমস্যাগুলোর অন্যতম। জমির মালিকানা নির্ধারণ, দখল ও উচ্ছেদ, উত্তরাধিকার বণ্টন, রেকর্ড সংশোধন কিংবা খাসজমি বন্দোবস্ত প্রায় প্রতিটি স্তরেই বিরোধের সম্ভাবনা নিহিত থাকে। এই বিরোধগুলো অনেক সময় শুধু একটি মামলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলমান থেকে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে স্থ’ায়ী অনিশ্চয়তা, সহিংসতা ও অবিশ্বাসের জন্ম দেয়। ফলে ভূমি প্রশ্ন বাংলাদেশে শুধু একটি আইনি ইস্যু নয়, এটি একটি গভীর সামাজিক ও নৈতিক সংকট। এই দীর্ঘসূত্রতা ও জটিলতার ফলে আদালতের ওপর অস্বাভাবিক চাপ সৃষ্টি হয়। হাজার হাজার ভূমি-সংক্রান্ত মামলা বছরের পর বছর বিচারাধীন থেকে যায়, যার নিষ্পত্তি না হওয়ায় বিচারপ্রার্থীরা ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা হারাতে বসে। কিন্তু সমস্যাটি শুধু বিচারব্যবস্থ’ার ওপর চাপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘমেয়াদি মামলা ভূমিহীন, দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের জন্য আরো মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনে। যাদের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত, আইনি জ্ঞান অপ্রতুল এবং সামাজিক প্রভাব নেই, তারা বহু ক্ষেত্রে আদালতের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্যেই কার্যত পরাজিত হয়ে পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে খাসজমি ও ভূমিহীনদের অধিকার প্রশ্নটি বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে। খাসজমি মূলত রাষ্ট্রের মালিকানাধীন সেই ভূমি, যা জনস্বার্থে বিশেষত ভূমিহীন, গৃহহীন ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসনের জন্য ব্যবহারের কথা। কিন্তু বাস্তবে খাসজমি নিয়ে বিরোধ, দখল, মামলা ও প্রশাসনিক জটিলতা এতটাই প্রকট যে প্রকৃত উপকারভোগীরা প্রায়ই এই জমি থেকে বঞ্চিত থাকে। ফলে যে খাসজমি হওয়ার কথা ছিল সামাজিক ন্যায়বিচারের হাতিয়ার, সেটিই অনেক সময় সংঘাত ও বৈষম্যের উৎসে পরিণত হয়।

বাংলাদেশের সংবিধান রাষ্ট্রকে একটি কল্যাণমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের দায়িত্ব দিয়েছে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থ’ান ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকারের সঙ্গে ভূমিহীনদের পুনর্বাসন ও খাসজমির ন্যায্য বণ্টন অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। কিন্তু যখন এই অধিকার বাস্তবায়নের পথ দীর্ঘসূত্র মামলা, প্রশাসনিক জটিলতা ও ক্ষমতার অসম ভারসাম্যের কারণে রুদ্ধ হয়ে যায়, তখন সংবিধানের ঘোষিত ন্যায়বিচার শুধু তাত্ত্বিক আদর্শে সীমাবদ্ধ থাকে। এই বাস্তবতায় বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ভূমি-ন্যায়বিচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী উপকরণ হিসেবে আলোচনায় এসেছে। এডিআর পদ্ধতির মূল দর্শন হলো দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল বিচারপ্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে দ্রুত, অংশগ্রহণমূলক ও মানবিক উপায়ে বিরোধের নিষ্পত্তি করা। ভূমি ও খাসজমি সংক্রান্ত বিরোধে এডিআর কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা গেলে একদিকে যেমন আদালতের ওপর চাপ হ্রাস পায়, অন্যদিকে তেমনি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ন্যায়বিচার আরো সহজলভ্য হয়ে ওঠে। তবে এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায়, খাসজমি ও ভূমিহীনদের সাংবিধানিক অধিকার শুধু বিরোধ নিষ্পত্তির একটি প্রশাসনিক সমস্যা, নাকি এটি রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্বের প্রশ্ন? এডিআর বা অন্য কোনো পদ্ধতি তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা সংবিধানের সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। অন্যথায় বিরোধ নিষ্পত্তি হলেও প্রকৃত ন্যায়বিচার অধরাই থেকে যাবে। এই প্রবন্ধে খাসজমি ও ভূমিহীনদের সাংবিধানিক অধিকার প্রশ্নটি তাই শুধু আইনগত বা প্রক্রিয়াগত আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং ভূমি বিরোধের বাস্তবতা, বিচারব্যবস্থ’ার সীমাবদ্ধতা এবং ন্যায়বিচারের বৃহত্তর দর্শনের আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণের প্রয়াস থাকবে। কারণ শেষ পর্যন্ত ভূমির প্রশ্ন মানেই মানুষের অস্তিত্ব, মর্যাদা ও ন্যায়ের প্রশ্ন, যার উত্তর একটি সমাজের ন্যায়বোধ ও রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতাকেই স্পষ্টভাবে উন্মোচিত করে।

বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি মূলত একটি প্রক্রিয়াগত পদ্ধতির চেয়েও বেশি কিছু- এটি একটি বিচার-দর্শন। এই দর্শনে বিরোধকে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক লড়াই বা জয়-পরাজয়ের দ্বন্দ্ব হিসেবে নয়, বরং পারস্পরিক বোঝাপড়া ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের একটি মানবিক সুযোগ হিসেবে দেখা হয়। আদালতের আনুষ্ঠানিক ও কাঠামোবদ্ধ বিচারপ্রক্রিয়ার বাইরে থেকে মধ্যস্থ’তা, সালিশ, সমঝোতা কিংবা আপসের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তিই এডিআরের মূল লক্ষ্য। এডিআরের কেন্দ্রে রয়েছে স্বেচ্ছাসম্মতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ন্যায়সংগত সমাধানের ধারণা। এখানে পক্ষগণ শুধু আইনের শুষ্ক ভাষায় আবদ্ধ থাকে না; বরং তারা নিজেদের বাস্তব প্রয়োজন, সামাজিক সম্পর্ক ও ভবিষ্যৎ সহাবস্থ’ানের বিষয়গুলোও আলোচনার টেবিলে তুলে ধরার সুযোগ পায়। এ কারণেই এডিআরকে অনেক সময় ‘মানবিক ন্যায়বিচার’-এর একটি কার্যকর রূপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ভূমি বিরোধের ক্ষেত্রে এই দর্শন বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। অধিকাংশ ভূমি বিরোধের পক্ষগণ একই পরিবারভুক্ত, আত্মীয়, প্রতিবেশী কিংবা একই গ্রামের বাসিন্দা। দীর্ঘদিনের আদালতমুখী বিরোধ শুধু একটি আইনি লড়াই নয়; সামাজিক সম্পর্ক ছিন্ন করার, পারিবারিক বন্ধন ভেঙে দেওয়ার এবং সহিংসতার বীজ বপনের একটি প্রক্রিয়াও বটে। এডিআর এই সামাজিক ক্ষয় কমিয়ে এনে সম্পর্ক রক্ষা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থ’ানের একটি বাস্তব সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে, যা প্রচলিত বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রায়ই অনুপস্থিত থাকে।

বাংলাদেশে ভূমি বিরোধের বাস্তবতা ঐতিহাসিকভাবে জটিল ও বহুমাত্রিক। ঔপনিবেশিক শাসনামল থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ভূমি প্রশাসন ব্যবস্থ’া আজও নানা অস্পষ্টতা ও অসামঞ্জস্য বহন করে চলেছে। বিভিন্ন সময়ের জরিপ, রেকর্ড, খতিয়ান, দলিল ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পারস্পরিক বিরোধ ভূমি মামলাকে আরো জটিল করে তুলেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জনসংখ্যার চাপ, ভূমির স্বল্পতা এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার অসম বণ্টন। ফলে ভূমি মামলা শুধু একটি আইনি প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সঙ্গে সামাজিক প্রভাব, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, অর্থনৈতিক স্বার্থ ও স্থ’ানীয় ক্ষমতার কাঠামো গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ে। এই বাস্তবতায় আদালতনির্ভর নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া প্রায়ই দীর্ঘ, ব্যয়সাধ্য ও মানসিকভাবে ক্লান্তিকর হয়ে ওঠে।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণার আগেই পক্ষগণের জীবন, সম্পদ ও সামাজিক সম্পর্ক ভেঙে পড়ে। ন্যায়বিচার তখন বাস্তব প্রাপ্তির পরিবর্তে শুধু একটি দূরবর্তী প্রতিশ্রুতি হয়ে থাকে। এই প্রেক্ষাপটে এডিআর ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির একটি বিকল্প সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে। এটি দীর্ঘসূত্রতার পরিবর্তে দ্রুত সমাধানের পথ দেখায় এবং বিরোধকে সহিংসতা ও শত্রুতার দিক থেকে ফিরিয়ে এনে আলোচনার পরিসরে নিয়ে আসে।

বাংলাদেশের আইনি ব্যবস্থ’ায় এডিআরের ধারণা সম্পূর্ণ নতুন নয়। দেওয়ানি কার্যবিধিতে সংশোধনের মাধ্যমে আদালত-সংযুক্ত মধ্যস্থ’তা ও সমঝোতার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। পারিবারিক আদালত আইন, অর্থঋণ আদালত আইন, গ্রাম আদালত আইনসহ বিভিন্ন বিশেষ আইনে আপস-মীমাংসার সুযোগ রাখা হয়েছে। ভূমিসংক্রান্ত কিছু দেওয়ানি মামলাতেও বিচারকগণ পক্ষদ্বয়কে সমঝোতার পথে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ দিয়ে থাকেন। তবে আইনে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ভূমি বিরোধে এডিআরের কার্যকর ও কাঠামোবদ্ধ প্রয়োগ এখনো সীমিত। অনেক ক্ষেত্রে এডিআর শুধু একটি আনুষ্ঠানিক ধাপ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, প্রকৃত সমাধানের মাধ্যম হিসেবে নয়। এর পেছনে রয়েছে প্রশিক্ষিত ও নিরপেক্ষ মধ্যস্থ’তাকারীর অভাব, পক্ষগণের অনীহা, আইনজীবীদের প্রতিরোধমূলক মনোভাব এবং সর্বোপরি এডিআর সম্পর্কে সাধারণ মানুষের পর্যাপ্ত সচেতনতার ঘাটতি। ভূমি বিরোধে এডিআর-এর সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হলো দ্রুত ও স্বল্প ব্যয়ে নিষ্পত্তি। দীর্ঘদিনের মামলা পরিচালনার পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হলে পক্ষগণ আর্থিকভাবে যেমন স্বস্তি পায়, তেমনি মানসিক চাপ থেকেও মুক্তি লাভ করে। দ্বিতীয়ত, সম্পর্ক রক্ষা ও সামাজিক স্থি’তি বজায় রাখার ক্ষেত্রে এডিআর-এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। মধ্যস্থ’তার মাধ্যমে সমাধান হলে শত্রুতা কমে এবং ভবিষ্যতে সহাবস্থ’ানের পথ উন্মুক্ত থাকে। এডিআর-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্থ’ানীয় বাস্তবতার প্রতিফলন। আদালতের আনুষ্ঠানিক রায়ে অনেক সময় সামাজিক ও পারিবারিক প্রেক্ষাপট উপেক্ষিত থাকে। কিন্তু এডিআর প্রক্রিয়ায় স্থ’ানীয় রীতি, সামাজিক সম্পর্ক, বাস্তব সীমাবদ্ধতা ও মানবিক দিকগুলো আলোচনায় স্থ’ান পায়। ফলে সমাধানটি অনেক ক্ষেত্রে অধিক বাস্তবসম্মত, গ্রহণযোগ্য ও টেকসই হয়।

ভূমি বিরোধে এডিআরের প্রয়োগে গুরুতর কিছু সীমাবদ্ধতা ও ঝুঁকিও রয়েছে। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো ক্ষমতার অসমতা। দরিদ্র, নিরক্ষর কিংবা প্রান্তিক পক্ষ প্রভাবশালী প্রতিপক্ষের সামাজিক বা অর্থনৈতিক চাপে আপসে বাধ্য হতে পারে। এই পরিস্থি’তিতে এডিআর ন্যায়বিচারের বিকল্প না হয়ে অন্যায়কে বৈধতা দেওয়ার হাতিয়ারে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি করে। আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো ভূমি বিরোধের আইনি জটিলতা। অনেক ক্ষেত্রে দলিল, রেকর্ড, খতিয়ান ও আইনি ব্যাখ্যার সূক্ষ্ম প্রশ্ন জড়িত থাকে, যা শুধু আপসের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়। এ ছাড়া এডিআর-এর সিদ্ধান্ত সব সময় আদালতের রায়ের মতো বাধ্যতামূলক ও কার্যকর হয় না, ফলে বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন বিরোধের জন্ম দিতে পারে। ন্যায়বিচারের চূড়ান্ত লক্ষ্য শুধু বিরোধের অবসান নয়; বরং ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা ও অধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে এডিআর তখনই গ্রহণযোগ্য, যখন তা স্বেচ্ছামূলক, নিরপেক্ষ, তথ্যভিত্তিক এবং ক্ষমতার ভারসাম্য বিবেচনাপ্রসূত হয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো এডিআর ব্যবস্থ’াকে এমনভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া, যাতে দুর্বল পক্ষের অধিকার সুরক্ষিত থাকে এবং প্রয়োজন হলে আদালতের দ্বার সর্বদা উন্মুক্ত থাকে। এডিআর-কে আদালতের বিকল্প নয়, বরং পরিপূরক ব্যবস্থ’া হিসেবে বিবেচনা করাই ন্যায়বিচারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যেখানে আপস সম্ভব এবং ন্যায়সংগত, সেখানে এডিআর কার্যকর হতে পারে; আর যেখানে মৌলিক অধিকার, খাসজমি বা ভূমিহীনদের সাংবিধানিক স্বার্থ জড়িত, সেখানে আদালতের সিদ্ধান্তই হওয়া উচিত চূড়ান্ত ও বাধ্যতামূলক।

ভূমি বিরোধে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থ’ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। দীর্ঘসূত্রতা, ব্যয়বহুল মামলা ও প্রজন্মব্যাপী আইনি সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এডিআর-আদালতের ওপর চাপ কমাতে, তুলনামূলকভাবে দ্রুত সমাধান দিতে এবং সামাজিক সম্পর্ক রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষত পারিবারিক, উত্তরাধিকার কিংবা প্রতিবেশভিত্তিক ভূমি বিরোধে এই পদ্ধতি বিরোধকে সহিংসতা ও শত্রুতার পথ থেকে ফিরিয়ে এনে আলোচনার টেবিলে বসানোর একটি মানবিক সুযোগ সৃষ্টি করে। তবে এই সম্ভাবনার সঙ্গে সঙ্গে এডিআরের সীমাবদ্ধতা ও ঝুঁকিগুলোও গভীরভাবে বিবেচনা করা অপরিহার্য। ভূমি বিরোধে ক্ষমতার অসমতা একটি বাস্তব ও গুরুতর সমস্যা। দরিদ্র, ভূমিহীন বা প্রান্তিক পক্ষ প্রভাবশালী প্রতিপক্ষের সামাজিক, রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক চাপে আপসে বাধ্য হলে এডিআর ন্যায়বিচারের বিকল্প না হয়ে অন্যায়কে বৈধতা দেওয়ার হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে। বিশেষত খাসজমি ও ভূমিহীনদের সাংবিধানিক অধিকার সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আপসের নামে রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা লঘু হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়; যা সংবিধানের মৌলিক দর্শনের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। ন্যায়বিচারের মূল লক্ষ্য শুধু বিরোধের আনুষ্ঠানিক নিষ্পত্তি নয়; বরং ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা ও অধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে এডিআর তখনই গ্রহণযোগ্য, যখন তা স্বেচ্ছামূলক, নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক হয় এবং যেখানে দুর্বল পক্ষের অধিকার সুরক্ষার জন্য পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা বিদ্যমান থাকে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো এডিআর ব্যবস্থ’াকে এমনভাবে কাঠামোবদ্ধ করা, যাতে ভূমিহীন ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী আপসের নামে তাদের ন্যায্য ও সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয় এবং প্রয়োজনে আদালতের দ্বার সর্বদা উন্মুক্ত থাকে।

খাসজমি ও ভূমিহীনদের অধিকার প্রশ্নে এডিআর কখনোই আদালতের বিকল্প হতে পারে না; বরং এটি সহায়ক ও পরিপূরক একটি ব্যবস্থ’া মাত্র। যেখানে বিরোধ প্রশাসনিক বা সামাজিক সমঝোতার মাধ্যমে ন্যায্যভাবে নিষ্পত্তি করা সম্ভব, সেখানে এডিআর কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু যেখানে রাষ্ট্রীয় সম্পদের ব্যবস্থ’াপনা, মৌলিক অধিকার কিংবা কাঠামোগত বৈষম্যের প্রশ্ন জড়িত, সেখানে বিচারিক তদারকি ও আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অপরিহার্য। শেষ পর্যন্ত ভূমি বিরোধে এডিআর-এর সাফল্য নির্ভর করে রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থ’ান ও সাংবিধানিক চেতনার ওপর। সতর্কতা, মানবিকতা ও ন্যায়বোধের আলোকে এই পদ্ধতির প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে ভূমি ও সম্পত্তিসংক্রান্ত ন্যায়বিচার শুধু মামলার রায়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তা ভূমিহীন ও প্রান্তিক মানুষের জীবনে বাস্তব নিরাপত্তা, মর্যাদা ও স্থি’তিশীলতার রূপ লাভ করবে। অন্যথায় বিকল্প পদ্ধতির মোড়কে ন্যায়বিচার আরেক দফা বিলম্বিত ও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কাই থেকে যাবে।
লেখক: আইনজীবী ও গবেষক্

ই-মেই ল: sarkerjahangiralam78@gmail.com

সানা/আপ্র/২৩/২/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

প্রত্যাশিত গণরায়, বাংলাদেশে নতুন সরকার এবং উন্নয়ন ও সুশাসনে করণীয়
১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

প্রত্যাশিত গণরায়, বাংলাদেশে নতুন সরকার এবং উন্নয়ন ও সুশাসনে করণীয়

জগদীশ সানা: শেষ হলো বাংলাদেশের প্রত্যাশিত জাতীয় নির্বাচন।  যাত্রা শুরু করলো নতুন সরকার। জাতীয় ন...

গণরায়ের ম্যান্ডেট ও রাষ্ট্রসংস্কারের অনিবার্যতা
১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

গণরায়ের ম্যান্ডেট ও রাষ্ট্রসংস্কারের অনিবার্যতা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি সন্ধিক্ষণ। ২০২৪ সালের গণঅভ্য...

মার্কিন রাজনীতির শোরগোল: নীরব সত্যের আড়ালে
০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

মার্কিন রাজনীতির শোরগোল: নীরব সত্যের আড়ালে

ড. জাহাঙ্গীর আলম সরকাররাজনীতিতে নীরবতা কখনো নিখুঁত নিরপেক্ষতা বহন করে না। আবার উচ্ছৃঙ্খল বা হঠকারী শ...

জাতীয় নির্বাচনের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

জাতীয় নির্বাচনের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

ড. জাহাঙ্গীর আলম সরকারভোটাধিকার শুধু একটি রাজনৈতিক অধিকার নয়; নাগরিক ও রাষ্ট্রের মধ্যে এক অদৃশ্য। কি...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

বাজারে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী গ্যাস সংকটের সুযোগে অতিরিক্ত দাম নিচ্ছে, এর মধ্যেই সরকার গ্যাস সিলিন্ডারের দাম বাড়িয়েছে। এটা কতটা যুক্তিসঙ্গত মনে করেন?

মোট ভোট: ৩ | শেষ আপডেট: 2 সপ্তাহ আগে