গণতন্ত্র কেবল নির্বাচনের প্রক্রিয়া নয়; এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, জবাবদিহি ও আইনের শাসনের সমন্বিত রূপ। সেই কাঠামোর অন্যতম স্তম্ভ হলো স্বাধীন ও নিরাপদ গণমাধ্যম। সাংবাদিক যদি হামলা, মামলা, সামাজিক অপমান কিংবা রাজনৈতিক ট্যাগের ভয়ে কাজ করেন, তা হলে রাষ্ট্রের তথ্যপ্রবাহ বিকৃত হয়, নাগরিকের জানার অধিকার ক্ষুণ্ন হয় এবং গণতন্ত্র ভেতর থেকে দুর্বল হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান এ বাস্তবতাকেই তুলে ধরে। Reporters Without Borders প্রকাশিত বিশ্ব সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা সূচক বারবার দেখিয়েছে-যেসব দেশে সাংবাদিকরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, সেসব দেশে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানও তুলনামূলকভাবে দুর্বল। একইভাবে Committee to Protect Journalists--এর তথ্য বলছে, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও দায়মুক্তির সংস্কৃতি দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দুর্নীতিকে উসকে দেয়। অর্থাৎ সংবাদকর্মীর নিরাপত্তা কোনো পেশাগত সুবিধা নয়; রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার পূর্বশর্ত।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোর অভিজ্ঞতা উদ্বেগজনক। গত দেড় দশকে নানা ধরনের মামলা, ডিজিটাল আইন প্রয়োগ, গ্রেফতার, এমনকি সংগঠিত মবচাপের ঘটনায় সাংবাদিক সমাজে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্না এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাংবাদিক আনিস আলমগীর-এর কারাবরণ কিংবা বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মীকে ‘দালাল’ বা ‘দোসর’ আখ্যা দিয়ে সামাজিক ও প্রশাসনিক চাপে ফেলার ঘটনা গণতান্ত্রিক সহনশীলতার ঘাটতি স্পষ্ট করে।
দেশের শীর্ষ দৈনিক প্রথম আলো ও The Daily Star-এর ওপর হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও দেখিয়েছে-সংবাদমাধ্যমকে প্রতিপক্ষ বানালে পরিস্থিতি কত দ্রুত অস্থির হয়ে উঠতে পারে।
রাজনৈতিক তত্ত্বও একই কথা বলে। উদার গণতন্ত্রের ধারণায় (লিবারেল ডেমোক্রেসি) রাষ্ট্রক্ষমতার ওপর ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ অপরিহার্য; গণমাধ্যম সেই অনানুষ্ঠানিক কিন্তু শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা। জন স্টুয়ার্ট মিল মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সত্যের অন্বেষণের শর্ত হিসেবে দেখেছিলেন-কারণ বিরোধী মত দমিয়ে দিলে সমাজ সত্যের কাছাকাছি যেতে পারে না। ফলে সমালোচনাকে শত্রুতা হিসেবে দেখার প্রবণতা শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাকেই দুর্বল করে।
স্বাধীন গণমাধ্যম ছাড়া গণতন্ত্র টিকে থাকতে পারে না-বর্তমান সরকারের তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের গত শনিবারের (২১ ফেব্রুয়ারি) দেওয়া এই বক্তব্য-আশাব্যঞ্জক। তবে বাস্তব পরীক্ষা হবে নীতিগত সংস্কারে। প্রথমত, সাংবাদিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। দ্বিতীয়ত, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক আইনসমূহ পর্যালোচনা করে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য আনা জরুরি। তৃতীয়ত, প্রশাসন ও রাজনৈতিক কর্মীদের স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে-সংবাদমাধ্যম কোনো শত্রুপক্ষ নয়।
গণমাধ্যমেরও আত্মসমালোচনা প্রয়োজন-তথ্যযাচাই, নৈতিকতা ও পেশাদারিত্বে আপস করলে স্বাধীনতার দাবিও দুর্বল হয়। কিন্তু বিচ্যুতির দায়ে পুরো পেশাকে ভয় দেখানো গণতান্ত্রিক সমাধান নয়।
যেখানে সাংবাদিক নিরাপদ নয়, সেখানে গণতন্ত্রও অনিরাপদ-এ সত্য অস্বীকার করার সুযোগ নেই। রাষ্ট্র যদি সত্যিই স্থিতিশীল ও শক্তিশালী হতে চায়, তা হলে তাকে সমালোচনাকে ধারণ করার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। কারণ মুক্ত কণ্ঠই শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তাবলয়।
সানা/আপ্র/২২/২/২০২৬