বাংলাদেশের আকাশে ১৪৪৭ হিজরির পবিত্র রমজানের চাঁদ দেখা যাওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে রহমত, মাগফেরাত ও নাজাতের মাস। মাহে রমজান কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সময় নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, সংযম ও তাকওয়া অর্জনের এক মহাসুযোগ। পবিত্র কোরআনের ঘোষণা-রোজা মানুষের মধ্যে তাকওয়া সৃষ্টি করে। অর্থাৎ রমজান আমাদের ব্যক্তিজীবনকে যেমন শুদ্ধ করতে আহ্বান জানায়, তেমনি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় আচরণেও নৈতিকতার প্রতিফলন ঘটাতে উদ্বুদ্ধ করে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, সংযমের এই মাসেই আমাদের সমাজে অসংযমের বহুমাত্রিক প্রকাশ দেখা যায়। বিশ্বের বহু মুসলিম দেশে রমজান উপলক্ষে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমানো বা বিশেষ ছাড় দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। অথচ আমাদের দেশে প্রায়শই দেখা যায় উল্টো প্রবণতা-কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এ মাসকে অধিক মুনাফা অর্জনের সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করেন। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, মজুতদারি এবং অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ায়। যে মাস ক্ষুধার্তের কষ্ট অনুধাবনের শিক্ষা দেয়, সেই মাসেই যদি বাজারে অমানবিকতা প্রাধান্য পায়, তবে তা রমজানের চেতনার পরিপন্থী।
এ প্রেক্ষাপটে সদ্য শপথ নেওয়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকের নির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি রমজানকে সামনে রেখে দ্রব্যমূল্য স্বাভাবিক রাখা, সেহরি-ইফতার ও তারাবির সময় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার ওপর জোর দিয়েছেন। পাশাপাশি সুশাসন, জবাবদিহিতা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। সরকারের এই অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হলে তা রমজানের আত্মিক তাৎপর্যকে সামাজিক পরিসরে অর্থবহ করে তুলবে।
রমজানে চুরি-ছিনতাইসহ অপরাধ বৃদ্ধির ঘটনাও উদ্বেগজনক। ইফতার ও তারাবির সময় মানুষের চলাচল বাড়ে; এ সুযোগে অসাধু চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। সংযমের মাসে এমন অনৈতিক কর্মকাণ্ড শুধু আইনভঙ্গ নয়, ধর্মীয় মূল্যবোধেরও চরম অবমাননা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি নাগরিক সচেতনতা ও সামাজিক প্রতিরোধও জরুরি।
রমজান আমাদের শেখায় আত্মসংযম, সহমর্মিতা ও ন্যায়পরায়ণতা। ব্যবসায়ী যদি ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রি করেন, প্রশাসন যদি দায়িত্বশীলতার সঙ্গে বাজার তদারকি করে, রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে এবং নাগরিকরা যদি ব্যক্তিজীবনে সততা চর্চা করেন-তবে রমজান সত্যিকার অর্থেই আত্মশুদ্ধি ও সুশাসনের মাসে পরিণত হতে পারে।
ইবাদতের আনুষ্ঠানিকতার বাইরেও রমজানের শিক্ষা আমাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক আচরণে প্রতিফলিত হওয়া উচিত। দরিদ্রের পাশে দাঁড়ানো, দুর্নীতি পরিহার, ন্যায়সংগত লেনদেন এবং আইন মেনে চলা-এসবই রমজানের প্রকৃত চর্চা। আমরা প্রত্যাশা করি, এ মাস হোক ব্যক্তিগত পরিশুদ্ধি ও প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের সম্মিলিত অভিযাত্রা। তাহলেই মাহে রমজান শুধু ধর্মীয় অনুভূতির নয়, জাতীয় নৈতিক জাগরণেরও মাস হয়ে উঠবে।
সানা/আপ্র/২০/২/২০২৬