অমর একুশে ফেব্রুয়ারি, মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আজ শনিবার। মাতৃভাষা আন্দোলনের ৭৪ বছর পূর্ণ হলো। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি পালিত হচ্ছে।
শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে দিবসের কর্মসূচি শুরু হয়েছে। একুশের প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টায় প্রধানমন্ত্রী শহীদ মিনারে পৌঁছান। তাঁর সঙ্গে মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যরাও শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন।
একুশের ভোরে কালো ব্যাজ ধারণ করে প্রভাতফেরি সহকারে আজিমপুর কবরস্থানে শহীদদের কবরে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ ও শ্রদ্ধা জানাবে সর্বস্তরের জনতা।
শহীদ দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস-২০২৬ উপলক্ষ্যে পৃথক পৃথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
দিবসটি উপলক্ষে রাজধানীজুড়ে আলোচনা সভাসহ নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা (ইউনেস্কো) কর্তৃক আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকে বিশ্বজুড়ে এ দিবসটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হয়ে আসছে। বাঙালি জাতির কাছে এটি একদিকে যেমন গভীর শোক ও বেদনার, অন্যদিকে মাতৃভাষার অধিকার আদায়ে সর্বোচ্চ ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল এক ঐতিহাসিক দিন।
১৯৫২ সালের এই দিনে ‘বাংলাকে’ রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে তৎকালীন পূর্ববাংলার (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) ছাত্র ও যুবসমাজ শাসকগোষ্ঠীর জারি করা ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে রাজপথে নেমে আসে। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে সালাম, জব্বার, শফিক, বরকত ও রফিকসহ নাম না জানা আরো অনেকে শহীদ হন। তাদের সেই আত্মত্যাগই আজ বিশ্বজুড়ে ভাষাপ্রেম ও অধিকার আদায়ের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একুশে ফেব্রুয়ারি সাধারণ ছুটি। এদিন দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে।
ভাষা শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনায় আজিমপুর কবরস্থানে ফাতেহা পাঠ ও কোরআনখানির আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া দেশের সব মসজিদ, মন্দির ও অন্যান্য উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হবে। দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরতে বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ সব স্যাটেলাইট চ্যানেল ও গণমাধ্যমে একুশের বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রকাশ করা হবে।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা: মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী। তিনি জানান, একুশে ফেব্রুয়ারি ঘিরে নিরাপত্তা নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই। শহীদ মিনার ও আশপাশ এলাকায় প্রায় ১৫ হাজার পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। থাকবে কয়েক স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পুলিশের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবকরাও কাজ করবেন।
শুক্রবার রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন। মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে এ ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়।
পুলিশ কমিশনার বলেন, ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বিপুল লোকসমাগম হবে। সে কারণে বোম্ব ডিস্পোজাল ইউনিট, সিসিটিভি ক্যামেরা, ডগ স্কোয়াডসহ সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গেও সমন্বয় করে কাজ করবে পুলিশ।
তিনি জানান, নগরীর বিভিন্ন সড়কেও নিরাপত্তা জোরদার থাকবে। নিরাপত্তার স্বার্থে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সন্ধ্যার পর ট্রাফিক ডাইভারশন দেওয়া হবে। মোট সাতটি স্থানে ডাইভারশন থাকবে এবং সবাইকে তা মেনে চলার অনুরোধ করা হয়েছে।
শুক্রবার সকালে শহীদ মিনারের প্রস্তুতি পরিদর্শন করেন পুলিশ কমিশনার। ডিএমপি কমিশনার অনুরোধ করে বলেন, ‘শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে পলাশীর মোড়, জগন্নাথ হল ক্রসিং ও শহীদ মিনার রোড ব্যবহার করতে হবে। অন্য কোনো সড়ক দিয়ে আসা যাবে না। শ্রদ্ধা নিবেদনের পর দোয়েল চত্বর অথবা চানখাঁরপুল দিয়ে বের হতে হবে।’ শহীদ মিনার এলাকায় কোনো ধরনের ধারালো বস্তু বা দাহ্য পদার্থ বহন না করারও অনুরোধ জানান শেখ মো. সাজ্জাত আলী। তিনি আরো বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও বিদেশি কূটনীতিকদের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর রাত ১২টা ৪০ মিনিটের দিকে সর্বস্তরের মানুষের জন্য কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।’
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নিরাপত্তাজনিত কোনো হুমকি নেই: র্যাব মহাপরিচালক: র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) মহাপরিচালক একেএম শহিদুর রহমান জানিয়েছেন, মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে কোনো নিরাপত্তাজনিত হুমকি নেই। তিনি বলেন, রাজধানীসহ সারাদেশে পর্যাপ্ত র্যাব সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে এবং নিরাপত্তার সব ব্যবস্থা সম্পূর্ণ রয়েছে।
শুক্রবার শুক্রবার সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি। মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে এ ব্রিফিং আয়োজন করা হয়।
প্রেস ব্রিফিংয়ে র্যাব মহাপরিচালক জানান, শহীদ মিনার কেন্দ্রিক নিরাপত্তার সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে র্যাব মোতায়েন করা হয়েছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা আজ থেকে শুরু হয়ে ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে। বিশেষ করে ২১ ফেব্রুয়ারি উদযাপনের সময় যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা রোধে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ভাষা শহীদদের স্মরণে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। র্যাব সদস্যরা শহীদ মিনার এলাকায় ওয়াচ টাওয়ার, চেক পোস্ট ও পর্যবেক্ষণ পোস্ট স্থাপন করে অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করবেন। তিনি আরো বলেন, শহীদ মিনার এলাকার ভেতরের এবং বাইরের পরিধি কঠোর ভিডিও নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। সিসিটিভি ও আইপি ক্যামেরার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ কক্ষে পর্যবেক্ষণ হবে। এছাড়া বোমা নিষ্ক্রিয়কারী ইউনিট ও ডগ স্কোয়াড নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করবে। র্যাবের বিশেষ বাহিনী সার্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকবে। র্যাব মহাপরিচালক বলেন, মহানগর, বিভাগীয় শহর, জেলা ও উপজেলায় পুষ্পস্তবক অর্পণ, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য শহীদ মিনারে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। র্যাব, সাদা পোশাকে কর্মকর্তা মোতায়েন ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়েছে। নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্যদের প্রবেশ আটকাতেও সক্রিয়ভাবে কাজ করছে র্যাব। র্যাব সদর দপ্তরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ দেশব্যাপী নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ ও সমন্বয় করবে। নাগরিকদের শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রেখে অনুষ্ঠান পালন করার আহ্বান জানান তিনি। তিনি আরো বলেন, ‘কোনও সন্দেহজনক কার্যকলাপ বা বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে নিকটতম টহল ইনচার্জ বা দায়িত্বশীল র্যাব ব্যাটালিয়ন কমান্ডারকে সঙ্গে সঙ্গে অবহিত করতে হবে। আমরা সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছি। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় র্যাব প্রস্তুত।’
সানা/আপ্র/২০/২/২০২৬