ঈদুল আজহা সামনে রেখে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কোরবানির পশুর হাট জমে উঠতে শুরু করেছে। কোটি কোটি টাকার নগদ লেনদেনকে কেন্দ্র করে এবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে জালনোট চক্র। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, হাটের ভিড়, দ্রুত লেনদেন এবং বিক্রেতাদের অসতর্কতার সুযোগ নিয়ে বাজারে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে বিপুল পরিমাণ জালনোট। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রকাশ্যে চলছে জালনোটের বিজ্ঞাপন, অর্ডার গ্রহণ ও সরবরাহের প্রতিশ্রুতি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদকে কেন্দ্র করে নগদ লেনদেন বেড়ে যাওয়ায় প্রতারক চক্র সাধারণ মানুষের অসতর্কতার সুযোগ নিচ্ছে। ভিড় ও তাড়াহুড়ার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই নোট যাচাই করা সম্ভব হয় না। তাদের মতে, জালনোটের বিস্তার শুধু অর্থনৈতিক অপরাধ নয়, এটি রাষ্ট্রের আর্থিক নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি। এতে সাধারণ মানুষ প্রতারিত হন, ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়েন এবং মুদ্রাব্যবস্থার প্রতি আস্থা ক্ষুণ্ন হয়।
সম্প্রতি রাজধানীর উত্তরা ও গাজীপুরের টঙ্গীতে অভিযান চালিয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ জালনোটসহ তিনজনকে আটক করেছে। এ সময় জালনোট তৈরির তিনটি বিশেষ মেশিন ও বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। অন্যদিকে মতিঝিলে অভিযান চালিয়ে দুই যুবককে গ্রেফতার করে র্যাব। তাদের কাছ থেকে জালনোট তৈরির সরঞ্জাম, কম্পিউটার, স্ক্যানার, রঙিন প্রিন্টার এবং ২০ হাজার টাকার জালনোট উদ্ধার করা হয়েছে।
গত ১৮ মে রাজধানীর মোহাম্মদপুর হাউজিং সোসাইটি এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১৮ হাজার ৯০০ টাকার জালনোট, একটি ল্যাপটপ ও জালনোট তৈরির মেশিনসহ সজিব হোসেন নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে র্যাব। বাহিনীটির দাবি, তিনি দীর্ঘদিন ধরে বাসায় মেশিন বসিয়ে জালনোট তৈরি করছিলেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে সংগৃহীত নকশা ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করতেন। এর আগে ২০২৪ সালেও একই অভিযোগে তিনি গ্রেফতার হয়েছিলেন।
এ ছাড়া গত ১৬ মে চট্টগ্রাম নগর ও জেলার পৃথক অভিযানে ১ লাখ ১৩ হাজার ৬০০ টাকার জালনোটসহ তিনজনকে গ্রেফতার করে র্যাব। বাহিনীটির দাবি, কোরবানির পশুর হাটে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এসব জালনোট প্রস্তুত করা হয়েছিল।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, কোরবানির পশুর হাটই এখন জালনোট চক্রের প্রধান লক্ষ্য। কারণ, এসব হাটে গভীর রাত পর্যন্ত বিপুল পরিমাণ নগদ লেনদেন হয় এবং অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে অনেক বিক্রেতা টাকা যাচাইয়ের সুযোগ পান না। বিশেষ করে রাতের শেষভাগে চক্রটি বেশি সক্রিয় থাকে।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী, সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন বাসা, গ্যারেজ ও আবাসিক ভবনে অস্থায়ী ছাপাখানা গড়ে তোলা হয়েছে। আধুনিক প্রিন্টার, স্ক্যানার, কাটিং যন্ত্র ও বিশেষ সরঞ্জাম ব্যবহার করে তৈরি করা হচ্ছে উন্নতমানের জালনোট। কিছু যন্ত্রাংশ ভারত, চীন ও দুবাই থেকে সীমান্তপথে আনা হচ্ছে বলেও গোয়েন্দারা তথ্য পেয়েছেন। পাশাপাশি বিশেষ কাগজ, নিরাপত্তা সুতা, হলোগ্রাম, রঙ পরিবর্তনকারী কালি ও অতিবেগুনি রশ্মি-সংবেদনশীল উপকরণ অনলাইন ও পাইকারি উৎস থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে।
গোয়েন্দাদের দাবি, পুরো নেটওয়ার্কটি কয়েকটি ধাপে পরিচালিত হয়। একদল নোটের নকশা ও ছাপার কাজ করে, অন্য দল পরিবহন এবং আরেক দল বাজারজাতকরণের দায়িত্ব পালন করে। আন্তজেলা কুরিয়ার, বাস ও পণ্যবাহী যানবাহনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে জালনোট।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চক্রটির তৎপরতা বেড়েছে। বিভিন্ন নামে পেজ ও গ্রুপ খুলে প্রকাশ্যেই ‘এ গ্রেড’ জালনোটের বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে। অনলাইনে অর্ডার গ্রহণ, অগ্রিম অর্থ লেনদেন এবং কুরিয়ারে সরবরাহের আশ্বাস দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে এ কার্যক্রম। তবে এসব প্ল্যাটফর্মে জালনোট বিক্রির আড়ালে প্রতারণার ঘটনাও ঘটছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ও আইনি দুর্বলতার সুযোগে অনেক জালনোট কারবারি সহজেই জামিন পেয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তাদের মতে, দ্রুত বিচার ও কার্যকর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
এদিকে ঈদকে সামনে রেখে জালনোট চক্রের তৎপরতা ঠেকাতে বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। র্যাব জানিয়েছে, রাজধানীর বিভিন্ন পশুর হাটে জালনোট শনাক্তকরণ যন্ত্র বসানো হচ্ছে। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণকক্ষ স্থাপন, সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি ও সিসি ক্যামেরা পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ডিবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইনভিত্তিক কার্যক্রমে নজরদারি বাড়িয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বড় অঙ্কের নগদ লেনদেনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জালনোটের বিস্তার রোধে জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। নোট গ্রহণের সময় জলছাপ, নিরাপত্তা সুতা, রঙ পরিবর্তনশীল কালি এবং কাগজের গঠন পরীক্ষা করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। সন্দেহজনক নোট পাওয়া গেলে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাতে হবে। তাদের মতে, কঠোর নজরদারি ও জনসচেতনতাই পারে জালনোটের বিস্তার কার্যকরভাবে রোধ করতে।
সানা/আপ্র/২৩/৫/২০২৬