রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করার ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা, নৈতিক চেতনা এবং বিচারিক সক্ষমতার ওপর এক ভয়াবহ অমানবিক আঘাত। যে শিশুর হাতে থাকার কথা ছিল বই, খাতা ও রঙিন স্বপ্ন, সেই শিশুর খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার হয়েছে পাশের ফ্ল্যাটের বাথরুম থেকে। এই বিভীষিকাময় বাস্তবতা রাষ্ট্র ও সমাজ-উভয়ের জন্য গভীর লজ্জা ও সতর্কবার্তা।
ঘটনার ভয়াবহতা আরো শিউরে ওঠার মতো, কারণ অভিযুক্ত ব্যক্তি কোনো অপরিচিত দুর্বৃত্ত নয়; সে ছিল প্রতিবেশী। একই ভবনে বসবাসকারী একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের হাতে একটি শিশুর এমন নির্মম পরিণতি প্রমাণ করে, আমাদের সামাজিক কাঠামোর ভেতরে ভয়ংকর নৈতিক অবক্ষয় নীরবে বিস্তার লাভ করছে। পরিবার, প্রতিবেশ ও নগরজীবনের যে পারস্পরিক আস্থা দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক নিরাপত্তার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে, এই ঘটনা সেই ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও স্বীকারোক্তিতে উঠে এসেছে-ধর্ষণের আলামত গোপন করতেই শিশুটিকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। এই নৃশংসতা কোনো তাৎক্ষণিক উন্মাদনার ফল নয়; এটি বিকৃত মানসিকতা, অপরাধপ্রবণতা এবং আইনের ভয়হীনতার এক ভয়াবহ বহিঃপ্রকাশ। সমাজে যখন অপরাধী বিশ্বাস করতে শুরু করে যে বিচার বিলম্বিত হবে, প্রভাব খাটিয়ে রেহাই পাওয়া যাবে কিংবা জনমনে ঘটনাটি একসময় ম্লান হয়ে যাবে-তখনই এমন পাশবিক অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটে।
রামিসা হত্যার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে যে জনবিক্ষোভ, মানববন্ধন ও সড়ক অবরোধ হয়েছে, তা নিছক আবেগের বিস্ফোরণ নয়; এটি বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে মানুষের গভীর ক্ষোভের প্রতিফলন। জনগণ আজ আর শুধু গ্রেফতার চায় না; তারা দ্রুত, স্বচ্ছ ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার দেখতে চায়। কারণ অতীতের বহু আলোচিত ঘটনায় দীর্ঘসূত্রতা মানুষের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তাই এই মামলায় দ্রুত চার্জশিট দাখিলের সরকারি নির্দেশ বাস্তব ফলাফলে রূপ না নিলে জনমনে হতাশা আরো তীব্র হবে।
কিন্তু কেবল বিচারের প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়। রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে, শিশু সুরক্ষা এখন জাতীয় নিরাপত্তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিটি আবাসিক ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নগর এলাকায় শিশু নিরাপত্তাবিষয়ক বাধ্যতামূলক নজরদারি ও সচেতনতা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। যৌন সহিংসতা প্রতিরোধে মনস্তাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ, অপরাধপ্রবণ ব্যক্তিদের তথ্যভান্ডার এবং স্থানীয় প্রশাসনের সক্রিয় তদারকি জরুরি হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে পরিবারকেও শিশুদের নিরাপত্তা বিষয়ে আরো সচেতন ও প্রস্তুত হতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, শিশু নির্যাতন ও হত্যাকে আর কেবল আইনশৃঙ্খলার বিচ্ছিন্ন সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি রাষ্ট্রের মানবিক ভিত্তি, সামাজিক ন্যায়বোধ এবং সভ্যতার মানদণ্ডের প্রশ্ন। একটি দেশ তখনই সত্যিকারের নিরাপদ হয়, যখন তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকও সুরক্ষিত থাকে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী রোববারের মধ্যেই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিলের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জক। এমন ভয়াবহ ও হৃদয়বিদারক ঘটনায় দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করে বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু করা রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলতার গুরুত্বপূর্ণ বহিঃপ্রকাশ। শুধু আশ্বাস নয়, আমরা চাই, শিশু রামিসা হত্যার এই নৃশংস ঘটনার সুষ্ঠু, দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত হোক। কোনো ধরনের গাফিলতি, দীর্ঘসূত্রতা বা প্রভাব যেন বিচারপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে না পারে। কারণ একটি শিশুর প্রতি এমন বর্বরতা কেবল একটি পরিবারের নয়, সমগ্র জাতির বিবেককে আহত করেছে। এই মামলার স্বচ্ছ ও কঠোর বিচারই ভবিষ্যতের সম্ভাব্য অপরাধীদের জন্য শক্ত বার্তা হয়ে উঠতে পারে।
সানা/আপ্র/২৩/৫/২০২৬