গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২৬

মেনু

দুর্নীতির দুর্গ ভাঙার প্রথম শর্ত ভূমি ব্যবস্থার শুদ্ধি

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১৪:২৭ পিএম, ২১ মে ২০২৬ | আপডেট: ১১:৫৪ এএম ২০২৬
দুর্নীতির দুর্গ ভাঙার প্রথম শর্ত ভূমি ব্যবস্থার শুদ্ধি
ছবি

ফাইল ছবি

বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে আতঙ্ক, অসহায়ত্ব ও অপমানের নামগুলোর একটি হলো ভূমি অফিস। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত একজন মানুষ যত রাষ্ট্রীয় সেবার মুখোমুখি হন, তার মধ্যে সবচেয়ে জটিল, ব্যয়বহুল এবং দুর্নীতিগ্রস্ত অভিজ্ঞতা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জমিজমাসংক্রান্ত কাজে। নামজারি, খতিয়ান, পর্চা, জমা-খারিজ, রেকর্ড সংশোধন কিংবা খাজনা-যে কাজই হোক না কেন, নাগরিকের সামনে যেন এক অদৃশ্য দুঃস্বপ্নের দরজা খুলে যায়। ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না, দালাল ছাড়া পথ মেলে না, আর প্রভাব ছাড়া ন্যায়বিচার পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। ভয়াবহ বাস্তবতা হলো, দীর্ঘদিনের এই দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থায় মানবিকতা পর্যন্ত ক্ষয়ে গেছে। বহু ক্ষেত্রে ভূমি অফিসে সাধারণ মানুষকে এমনভাবে ঘুরানো হয়, যেন নাগরিক নয়, তারা করুণা প্রার্থী কোনো অসহায় প্রাণী।

এ বাস্তবতা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক বিপর্যয়। কারণ ভূমি কেবল সম্পত্তি নয়, মানুষের নিরাপত্তা, বেঁচে থাকা, পরিবার, ভবিষ্যৎ ও অস্তিত্বের প্রশ্ন। সেই জায়গাটিকেই যদি দুর্নীতির বাজারে পরিণত করা হয়, তাহলে আইনের শাসন, গণতন্ত্র কিংবা কল্যাণরাষ্ট্র-সবই কাগুজে স্লোগানে পরিণত হয়। একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের সবচেয়ে মৌলিক অধিকারগুলোর একটি হলো নিজের সম্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অথচ বাংলাদেশে ভূমিসংক্রান্ত জটিলতা বহু মানুষকে পথে বসিয়েছে, পরিবার ধ্বংস করেছে, সামাজিক সংঘাত বাড়িয়েছে এবং অসংখ্য মানুষকে বছরের পর বছর আদালতের বারান্দায় নিঃস্ব করেছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রযুক্তিনির্ভর, হয়রানিমুক্ত ও নাগরিকবান্ধব ভূমি ব্যবস্থাপনার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। অনলাইন সেবা, ই-নামজারি, ডিজিটাল রেকর্ড ও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে মানুষের দুর্ভোগ কমতে পারে। কিন্তু এখানে মূল প্রশ্ন প্রযুক্তির নয়, রাজনৈতিক সদিচ্ছার। কারণ দুর্নীতির শেকড় কেবল কাগজে নয়, প্রভাবশালী স্বার্থগোষ্ঠীর গভীরে প্রোথিত। ভূমি অফিসকে কেন্দ্র করে যে অবৈধ অর্থনীতির বিস্তার ঘটেছে, তা বহু মানুষের জন্য নিয়মিত আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে। ফলে সংস্কারের ঘোষণা দেওয়া সহজ, কিন্তু সেই দুর্নীতির উৎসে আঘাত হানা অত্যন্ত কঠিন।

আজ দেশের আদালতগুলোতে বিচারাধীন মামলার বড় অংশই ভূমিসংক্রান্ত। ডিসি অফিসগুলোতে একই অবস্থা। এর মানে দাঁড়ায়, রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থা থেকে শুরু করে সামাজিক স্থিতি পর্যন্ত-সবখানেই এই খাতের অরাজকতার বিষ ছড়িয়ে পড়েছে। জমি নিয়ে বিরোধ এখন শুধু আইনি লড়াই নয়; এটি অনেক ক্ষেত্রে সহিংসতা, শত্রুতা এবং রক্তপাতের কারণ। এ অবস্থায় ভূমি ব্যবস্থার শুদ্ধি আর কোনো সাধারণ প্রশাসনিক সংস্কারের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্র পুনর্গঠনের অপরিহার্য শর্ত।

সবচেয়ে কঠিন কিন্তু সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি তাই এখানেই-রাষ্ট্র কি সত্যিই ভূমিখাতের দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন হতে প্রস্তুত? সরকার কি নীতিগতভাবে সেই হাজার হাজার কোটি টাকার অবৈধ লেনদেনের পথ বন্ধ করতে চায়, যেখান থেকে অসাধু চক্র বছরের পর বছর সুবিধা নিচ্ছে? যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তাহলে এখনই দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। দালালচক্র ভাঙতে হবে, দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে, এবং নাগরিককে ঘুষ ছাড়া সেবা পাওয়ার বাস্তব নিশ্চয়তা দিতে হবে।
ভূমি ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে শক্তিশালী ডিজিটাল অভিযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। কোনো কর্মকর্তা, কর্মচারী বা দালাল ঘুষ দাবি করলে কিংবা ইচ্ছাকৃত হয়রানি করলে ভুক্তভোগী নাগরিক যেন তাৎক্ষণিকভাবে অনলাইনে অভিযোগ জানাতে পারেন এবং সেই অভিযোগ সরাসরি কেন্দ্রীয় তদারকি ব্যবস্থার আওতায় আসে। অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত তদন্ত, অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার এবং প্রমাণ মিললে কঠোর আইনি ব্যবস্থার বাধ্যতামূলক বিধান থাকতে হবে। বছরের পর বছর সাধারণ মানুষকে মিথ্যা মামলা, জটিলতা ও হয়রানির ফাঁদে ফেলা হয়েছে; এখন সময় এসেছে দুর্নীতিবাজদেরই আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর। রাষ্ট্রকে এমন বার্তা স্পষ্টভাবে দিতে হবে-ভূমি অফিস আর কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর ব্যক্তিগত ক্ষমতার কেন্দ্র নয়, এটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করার প্রতিষ্ঠান।

মনে রাখা জরুরি-বাংলাদেশে সুশাসনের প্রকৃত সূচনা হবে কোনো বড় রাজনৈতিক ভাষণ দিয়ে নয়; হবে ভূমি অফিসের একটি দরজায় সাধারণ মানুষকে সম্মান ও ন্যায়বিচার দেওয়ার মধ্য দিয়ে। কারণ রাষ্ট্রের মানবিক মুখ সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায় নাগরিকের দুর্ভোগ লাঘবে। আর সেই পরীক্ষায় বহু বছর ধরে ব্যর্থ ভূমি প্রশাসনকে এখন বদলাতেই হবে। 
সানা/আপ্র/২১/৫/২০২৬

 

সংশ্লিষ্ট খবর

সড়কে নীরব মহামারি রোধে কঠোর পদক্ষেপ দরকার
০৬ আগস্ট ২০২৬

সড়কে নীরব মহামারি রোধে কঠোর পদক্ষেপ দরকার

জনের প্রাণহানির পরিসংখ্যান আমাদের জাতীয় বিবেককে নতুন করে নাড়া দিয়েছে। প্রতিদিন ঝরে যাওয়া এই তাজা প্র...

বাংলাদেশে হামের সাম্প্রতিক ভয়াবহ বিস্তার এখন শুধু একটি সংক্রামক রোগের সংকট
০৬ আগস্ট ২০২৬

বাংলাদেশে হামের সাম্প্রতিক ভয়াবহ বিস্তার এখন শুধু একটি সংক্রামক রোগের সংকট

বাংলাদেশে হামের সাম্প্রতিক ভয়াবহ বিস্তার এখন শুধু একটি সংক্রামক রোগের সংকট নয়; এটি রাষ্ট্রীয় জবাবদিহ...

রাজধানী যখন আতঙ্কের প্রতীক, নিরাপত্তা সংস্কারে আর বিলম্ব নয়
০৪ আগস্ট ২০২৬

রাজধানী যখন আতঙ্কের প্রতীক, নিরাপত্তা সংস্কারে আর বিলম্ব নয়

ঢাকা বাংলাদেশের প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্র। এই শহরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি শুধু রাজধানীবা...

জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতার বিপজ্জনক অশনিসংকেত
০৩ আগস্ট ২০২৬

জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতার বিপজ্জনক অশনিসংকেত

রাজধানীর রান্নাঘরে চুলা জ্বলছে না, শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ব্যাহত, সিএনজি স্টেশনে রাতভর অপেক্ষা, আর বিদ্য...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

শেখ হাসিনার বক্তব্য সমর্থন করে না ভারত, জানালেন জয়সওয়াল

বাংলাদেশের বর্তমান বৈধ ও গঠিত সরকারের বিষয়ে ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া বক্তব্য সমর্থন করে না নয়াদিল্লি। শুক্রবার (৭ আগস্ট) ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এ কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “এই অনুষ্ঠান সম্পর্কে আমাদের অবস্থান আগেই স্পষ্ট করা হয়েছে। আমি আবারো সেটিই বলছি। এটি একটি বেসরকারি সংবাদমাধ্যম আয়োজিত অনুষ্ঠান ছিল, যেখানে ভারত সরকারের কোনো ভূমিকা ছিল না।” প্রিয় পাঠক. আপনি কি মনে করেন ভারত সঠিক বলেছে?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 7 ঘন্টা আগে