বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ একসময় দারিদ্র্য বিমোচনের বিকল্প মডেল হিসেবে বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছিল। বলা হয়েছিল, প্রান্তিক মানুষের হাতে ক্ষুদ্র পুঁজি পৌঁছে দিয়ে অর্থনৈতিক মুক্তির পথ তৈরি করা হবে। কিন্তু দীর্ঘ কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা, গবেষণা এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা আজ এক ভিন্ন প্রশ্ন সামনে এনেছে- ক্ষুদ্রঋণ কি সত্যিই দারিদ্র্য দূর করেছে, নাকি দারিদ্র্যকেই স্থায়ী পুঁজি বানিয়ে একটি শক্তিশালী প্রভাবশালী গোষ্ঠীর উত্থান ঘটিয়েছে?
এই প্রশ্ন এখন আর কেবল অর্থনীতির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই; এটি রাষ্ট্র, সমাজ, রাজনীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নেও রূপ নিয়েছে। কারণ ক্ষুদ্রঋণভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি অংশ আজ এমন আর্থিক ও সামাজিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে, যারা শুধু অর্থনীতিতেই নয়, নীতিনির্ধারণ, রাজনীতি, শিক্ষা, গণমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও গভীর প্রভাব বিস্তার করছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এই বলয়ের বড় অংশ বিদেশি দাতা সংস্থা ও বহিরাগত শক্তির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থনে পরিচালিত হয়েছে বলে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে- উন্নয়নের নামে গড়ে ওঠা এই কাঠামো আদৌ কতটা জাতীয় স্বার্থনির্ভর?
গ্রামীণ ব্যাংকের সুদের হার নিয়ে হাই কোর্টের সাম্প্রতিক প্রশ্ন তাই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দরিদ্র মানুষের জন্য পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠানের ঋণের সুদ কেন প্রচলিত ব্যাংকের তুলনায় বেশি হবে এবং ঋণগ্রহীতারা কেন সমান আর্থিক সুরক্ষা পাবেন না- আদালতের এই অনুসন্ধান রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে। কারণ বাস্তবতা হলো, বহু দরিদ্র পরিবার ঋণের চক্রে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়েছে, অথচ ক্ষুদ্রঋণভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ, প্রভাব ও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক বিস্ময়করভাবে বিস্তৃত হয়েছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো, এই তথাকথিত উন্নয়নকেন্দ্রিক সুশীল বলয়ের একটি অংশ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখার অভিযোগে আলোচিত হয়েছে। স্বাধীনতাবিরোধী ও উগ্রপন্থায় অভিযুক্ত বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক সমঝোতা, রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে দুর্বল করার প্রচেষ্টা এবং আইনশৃঙ্খলার পরিবর্তে ‘মব সংস্কৃতি’কে প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ জনমনে গভীর অস্বস্তি তৈরি করেছে। এমনকি দেশের নাম, ইতিহাস ও স্বাধীনতার স্মারক বিষয়েও বিতর্কিত বক্তব্য উঠে এসেছে কিছু মহল থেকে, যা জাতীয় চেতনার জন্য স্পষ্টতই উদ্বেগজনক।
একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অবশ্যই থাকবে। কিন্তু সেই স্বাধীনতা কখনোই রাষ্ট্রের ভিত্তি, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বা জাতীয় পরিচয়কে দুর্বল করার হাতিয়ার হতে পারে না। উন্নয়ন কিংবা মানবাধিকারের ভাষা ব্যবহার করে যদি বিদেশি স্বার্থ, প্রভাবরাজনীতি বা অস্থিতিশীলতার ক্ষেত্র তৈরি করা হয়, তবে তা নিঃসন্দেহে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস আন্তর্জাতিকভাবে সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। কিন্তু কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রীয় আইন ও জবাবদিহির ঊর্ধ্বে নয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো- ক্ষুদ্রঋণ খাতের সুদহার, কর সুবিধা, আর্থিক কাঠামো, বিদেশি অর্থায়ন এবং রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়গুলো নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে পর্যালোচনা করা। কারণ দারিদ্র্য দূরীকরণ যদি সত্যিই লক্ষ্য হয়, তবে তা হতে হবে উৎপাদন, কর্মসংস্থান, কৃষি, শিল্প ও মানবিক অর্থনীতিনির্ভর; সুদের ওপর দাঁড়ানো প্রভাবের সাম্রাজ্য গড়ে তুলে নয়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা কোনো গোষ্ঠীর অর্থনৈতিক বা আন্তর্জাতিক প্রভাবের কাছে জিম্মি হতে পারে না।
অতএব, এখন সময় এসেছে- উন্নয়নের নামে গড়ে ওঠা সব প্রভাববলয়কে রাষ্ট্রীয় ন্যায্যতা, জবাবদিহি ও জাতীয় স্বার্থের আলোয় পুনর্মূল্যায়নের।
সানা/আপ্র/২০/৫/২০২৬