বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন, মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবে খাদ্য সংকটের ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। জাতিসংঘ সমর্থিত গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস ২০২৫-এ বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশকে তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ২৬ কোটি ৬০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটে ভুগছে। এর বড় একটি অংশ আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, সুদান, সিরিয়া ও ইয়েমেনসহ কয়েকটি দেশে কেন্দ্রীভূত।
বাংলাদেশে পরিস্থিতিকে একদিকে কিছুটা উন্নতির ইঙ্গিতপূর্ণ বলা হলেও এটিকে ভঙ্গুর ও অস্থায়ী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দেশে প্রায় এক কোটি ৫৬ লাখ মানুষ সংকটজনক খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে এবং আরো প্রায় ৪০ লাখ মানুষ জরুরি খাদ্য সংকটের ঝুঁকিতে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে খাদ্য সংকট এখন শুধু খাদ্যের প্রাপ্যতার বিষয় নয়, বরং এটি ক্রয়ক্ষমতা, পুষ্টি, বৈষম্য ও জলবায়ু ঝুঁকির সম্মিলিত সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের উচ্চমূল্যের কারণে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি চাপের মধ্যে রয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও পুনরাবৃত্ত বন্যাকে খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যা ও অতিবৃষ্টিতে চলতি মৌসুমে বিস্তীর্ণ এলাকায় বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিভিন্ন জেলায় হাজার কোটি টাকার ফসলহানির আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২২ ও ২০২৪ সালের বন্যায় লাখ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এ ধরনের দুর্যোগ এখন নিয়মিত বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে। ফলে খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থায় স্থায়ী চাপ তৈরি হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে খাদ্যে সরকারি ভর্তুকি কমানোর পরিকল্পনা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী বাজেটে খাদ্য ভর্তুকি কিছুটা কমানো হতে পারে। তবে একই সময়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সার খাতে বড় অঙ্কের ভর্তুকি অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাদ্য ভর্তুকি কমানো হলে টিসিবি, ওএমএস ও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ওপর চাপ বাড়বে এবং নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা আরো ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
সরকারের পক্ষ থেকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণের মাধ্যমে প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষের সহায়তার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই নয়, বরং লক্ষ্যভিত্তিক ও স্বচ্ছ বাস্তবায়নই মূল চ্যালেঞ্জ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের খাদ্য সংকট একটি কাঠামোগত সমস্যা, যেখানে আয় বৈষম্য, অনিশ্চিত কর্মসংস্থান, জলবায়ু ঝুঁকি ও দুর্বল সামাজিক সুরক্ষা একসঙ্গে কাজ করছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে জলবায়ু সহনশীল কৃষি, আধুনিক খাদ্য মজুত ব্যবস্থা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা এবং কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের খাদ্য পরিস্থিতি এখন এক বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখে। বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যকে শুধু অর্থনৈতিক বা কৃষি ইস্যু হিসেবে না দেখে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা না করলে ভবিষ্যতের ঝুঁকি আরো গভীর হবে।
সানা/আপ্র/২০/৫/২০২৬