জাতীয় বাজেট কেবল রাষ্ট্রের আয়-ব্যয়ের বার্ষিক হিসাব নয়; একটি সরকারের রাজনৈতিক দর্শন, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন। কোন খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হবে, কার ওপর করের বোঝা বাড়বে, কারা স্বস্তি পাবে- এসব সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ধারণ করে। সেই বিবেচনায় আসন্ন জাতীয় বাজেটকে ঘিরে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যে উৎসে কর বাড়ানোর প্রস্তাব গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। কারণ এমন এক সময়ে এই চিন্তা সামনে এসেছে- যখন দেশের সাধারণ মানুষ দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি, আয় সংকোচন ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির চাপে কার্যত বিপর্যস্ত। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, গম, আলু, পেঁয়াজ, চিনি, ফল ও মসলাসহ অন্তত ২৮টি নিত্যপণ্যের স্থানীয় সরবরাহে উৎসে কর শূন্য দশমিক ৫০ থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশ করার পরিকল্পনা নিছক একটি কর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; সরাসরি মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা ও জীবনমানের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি সংবেদনশীল বিষয়। বাস্তবতা হলো, বাজারব্যবস্থায় কোনো করই শেষ পর্যন্ত ব্যবসায়ীর কাঁধে থাকে না। অতিরিক্ত ব্যয়ের সম্পূর্ণ চাপ পণ্যমূল্যের মাধ্যমে ভোক্তার ওপরই এসে পড়ে। ফলে এই ধরনের পদক্ষেপ মূল্যস্ফীতির আগুনে নতুন করে ঘি ঢালার শামিল হতে পারে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করছে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় অংশকে প্রতিদিন হিসাব কষে বাজার করতে হচ্ছে। বহু পরিবার ইতোমধ্যে পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ কমিয়ে দিয়েছে, অনেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদাও সীমিত করতে বাধ্য হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় নিত্যপণ্যে নতুন কর আরোপ বা বিদ্যমান কর বাড়ানোর চিন্তা অর্থনৈতিক বিচক্ষণতার চেয়ে জনদুর্ভোগ বাড়ানোর ঝুঁকিকেই বড় করে তোলে। নিঃসন্দেহে সরকারের সামনে কঠিন বাস্তবতা রয়েছে। রাজস্ব ঘাটতি বাড়ছে, কর-জিডিপি অনুপাত আশানুরূপ নয়, আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর চাপও ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- রাষ্ট্র কি বারবার একই সহজ পথেই হাঁটবে? সীমিতসংখ্যক করদাতার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে কিংবা সাধারণ মানুষের নিত্যব্যবহারের পণ্যে কর বাড়িয়ে টেকসই রাজস্ব কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব নয়; বরং প্রয়োজন কর প্রশাসনের গভীর সংস্কার, করফাঁকি রোধ, অবৈধ অর্থপাচার নিয়ন্ত্রণ এবং অপ্রদর্শিত সম্পদ ও বিলাসী ভোগের ওপর কার্যকর কর আরোপ।
এখানে সরকারের সাম্প্রতিক অবস্থান কিছুটা আশাব্যঞ্জক। প্রধানমন্ত্রী যে স্পষ্টভাবে বলেছেন, নতুন বাজেট কোনোভাবেই যেন জনঅসন্তোষ সৃষ্টি না করে এবং নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর নতুন চাপ না পড়ে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। নিত্যপণ্যে কর বৃদ্ধির প্রস্তাব পুনর্বিবেচনার নির্দেশও জনমনের উদ্বেগ উপলব্ধির ইঙ্গিত বহন করে। একই সঙ্গে করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি এবং উচ্চ সম্পদের ওপর সম্পদ কর আরোপের পরিকল্পনা তুলনামূলক ন্যায়সংগত করনীতির দিকেই ইঙ্গিত দেয়। কারণ রাষ্ট্রের দায়িত্ব দুর্বল মানুষের কাঁধে অতিরিক্ত বোঝা চাপানো নয়; বরং সামর্থ্যবানদের কাছ থেকে ন্যায্য অবদান নিশ্চিত করা। তবে কেবল ঘোষণায় নয়, বাস্তব প্রয়োগেই সরকারের সদিচ্ছার পরীক্ষা হবে।
অতীতে বহুবার দেখা গেছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাজারে কার্যকর তদারকির অভাব, সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য এবং নীতিগত অসামঞ্জস্যের কারণে সাধারণ মানুষকে শেষ পর্যন্ত চড়া মূল্যই দিতে হয়েছে। তাই এবারের বাজেটে জনস্বার্থকে সত্যিকার অর্থে অগ্রাধিকার দিতে হলে করনীতি, বাজারব্যবস্থা ও প্রশাসনিক জবাবদিহির মধ্যে সমন্বিত সংস্কার জরুরি। বলা বাহুল্য যে, রাষ্ট্রের অর্থনীতি মানুষের জন্য; মানুষ অর্থনীতির জন্য নয়। যে বাজেট মানুষের খাদ্য, জীবনযাত্রা ও ন্যূনতম স্বস্তিকে উপেক্ষা করে কেবল রাজস্ব বৃদ্ধির দিকে তাকিয়ে থাকে; ওই বাজেট কখনোই দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা আনতে পারে না। এখন সময় এমন একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও দূরদর্শী বাজেট প্রণয়নের- যেখানে রাজস্ব আহরণের চেয়ে বড় হয়ে উঠবে মানুষের জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা।
সানা/এসি/আপ্র/১৭/০৫/২০২৬