ধূমপান কেবল একটি ব্যক্তিগত অভ্যাস নয়; এটি এক ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সংকট, যা নিঃশব্দে একটি জাতির উৎপাদনশীলতা, অর্থনীতি এবং মানবিক সম্ভাবনাকে ক্ষয় করে। এমন প্রেক্ষাপটে সিগারেটের দাম সর্বনিম্ন ১৭ থেকে সর্বোচ্চ ৩৫ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব নিছক আর্থিক সমন্বয় নয়, বরং এটি একটি সুদূরপ্রসারী জনকল্যাণমুখী নীতিগত উদ্যোগ-যা সময়োপযোগী, যুক্তিসম্মত এবং অপরিহার্য।
আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে প্রতি শলাকা সিগারেটের দাম সর্বনিম্ন ১৭ থেকে সর্বোচ্চ ৩৫ টাকা নির্ধারণের এই প্রস্তাব দিয়েছে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন এবং ইউনাইটেড ফোরাম অ্যাগেইনস্ট টোব্যাকো নামের দুটি সংগঠন। গত সোমবার (১১ মে) জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলন থেকে এমন প্রস্তাব জানায় সংগঠন দুটি।
উপস্থাপিত প্রস্তাবে চারটি পৃথক মূল্যস্তর-প্রিমিয়াম, উচ্চ, মধ্যম ও নিম্ন-নির্ধারণ করে সিগারেটের মূল্য কাঠামো পুনর্বিন্যাসের কথা বলা হয়েছে। এতে প্রিমিয়াম স্তরে প্রতি শলাকার মূল্য ৩৫ টাকা, উচ্চ স্তরে প্রায় ২৫ টাকা ৪৫ পয়সা এবং মধ্যম ও নিম্ন স্তরে প্রায় ১৭ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর সঙ্গে উচ্চহারে আবগারি শুল্ক এবং নির্দিষ্ট কর সংযোজনের বিষয়টি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, মূল্য বৃদ্ধির মাধ্যমে একদিকে যেমন ভোক্তার আচরণে পরিবর্তন আনা সম্ভব, অন্যদিকে রাষ্ট্রের রাজস্ব আহরণও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো যায়।
এই প্রস্তাবের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো-এর সুস্পষ্ট জনস্বাস্থ্যভিত্তিক যুক্তি। গবেষণালব্ধ তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবটি কার্যকর হলে প্রায় পাঁচ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি ধূমপান থেকে বিরত থাকতে উৎসাহিত হবেন এবং তিন লাখেরও বেশি তরুণ ধূমপান শুরু করা থেকে বিরত থাকবেন। আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো-দীর্ঘমেয়াদে বিপুলসংখ্যক মানুষের অকালমৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। এটি নিছক পরিসংখ্যান নয়; এর পেছনে রয়েছে অসংখ্য পরিবারকে দুঃখ, দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তা থেকে রক্ষা করার সম্ভাবনা।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে ধূমপানের আর্থসামাজিক প্রভাব আরো গভীর। নিম্ন আয়ের মানুষের একটি বড় অংশ তাদের সীমিত আয়ের একটি অংশ ব্যয় করে তামাকজাত দ্রব্যে, যা তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবারকে অর্থনৈতিক দুরবস্থার দিকে ঠেলে দেয়। ক্যান্সার, শ্বাসকষ্টসহ নানা জটিল রোগের চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে গিয়ে বহু পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ে। সুতরাং সিগারেটের মূল্যবৃদ্ধি কেবল একটি স্বাস্থ্যনীতি নয়, এটি একটি সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নও।
একই সঙ্গে প্রস্তাবিত মূল্যবৃদ্ধির ফলে তামাক কর থেকে রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে-যা রাষ্ট্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সুযোগ। এই অতিরিক্ত রাজস্ব যদি স্বাস্থ্যখাত, শিক্ষা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ করা হয়, তবে তা বহুমাত্রিক ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করবে। অর্থাৎ, একদিকে ক্ষতিকর পণ্যের ব্যবহার কমবে, অন্যদিকে সেই খাত থেকেই সংগৃহীত অর্থ জনকল্যাণে ব্যয় হবে-এ এক দ্বিমুখী সুফল।
তবে এ ধরনের নীতি বাস্তবায়নে সরকারের দৃঢ়তা ও সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য। কেবল মূল্য বৃদ্ধি করলেই চলবে না; এর সঙ্গে অবৈধ বাজার নিয়ন্ত্রণ, কর ফাঁকি প্রতিরোধ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম সমানভাবে জোরদার করতে হবে। অন্যথায় কাক্সিক্ষত ফল অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।
অতএব, সিগারেটের মূল্য বৃদ্ধির এই প্রস্তাবকে আর দেরি না করে নীতিনির্ধারণের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া উচিত। এটি একটি মানবিক, বিজ্ঞানসম্মত এবং ভবিষ্যতমুখী সিদ্ধান্ত-যা একটি সুস্থ, সচেতন ও উৎপাদনশীল জাতি গঠনের পথে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।
সানা/আপ্র/১৪/৫/২০২৬