কিছু মানুষ থাকেন, যাঁরা কেবল প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন না-একটি জাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন বুনে যান। বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ইমামুল কবীর শান্ত ছিলেন তেমনই এক নীরব স্বপ্নকারিগর; যিনি জীবনকে দেখেছিলেন দায়বদ্ধতার আয়নায়, আর মানুষকে দেখেছিলেন সম্ভাবনার মহাকাব্য হিসেবে। তাঁর জীবন ছিল সংগ্রাম, মানবকল্যাণ, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও দায়িত্ববোধের এক অনন্য আলোকগাথা।
ইমামুল কবীর শান্ত পেশাদার সাংবাদিক ছিলেন না, অথচ সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ ছিল বিস্ময়কর। প্রতিদিন রাত সাড়ে আটটা থেকে নয়টার মধ্যে তিনি তাঁর সম্পাদিত দৈনিক আজকের প্রত্যাশা-এর প্রধান শিরোনাম নিয়ে নিউজ এডিটরের সঙ্গে আলোচনা করতেন। মধ্যরাতে টেলিভিশনের পত্রিকা পর্যালোচনা অনুষ্ঠানও নিয়মিত দেখতেন। একটি বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর চেয়ারম্যান হয়েও সংবাদমাধ্যমের প্রতি এমন নিবিড় মমত্ব আমাদের দেশে সত্যিই বিরল। কারণ তিনি সংবাদপত্রকে কখনও কেবল ব্যবসার উপকরণ ভাবেননি; তিনি এটিকে দেখেছিলেন সমাজ জাগরণের শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে।
তাঁর জীবনের সবচেয়ে গভীর উচ্চারণ ছিল-“মা, আমার যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি।” এই একটি বাক্যের মধ্যেই যেন তাঁর সমগ্র জীবনের দর্শন নিহিত। মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া কিশোর শান্ত যুদ্ধ শেষে সহযোদ্ধাদের লাশ, ভাঙা স্বপ্ন ও বৈষম্যবিদ্ধ সমাজ দেখে উপলব্ধি করেছিলেন-শুধু ভৌগোলিক স্বাধীনতা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি, সাংস্কৃতিক বিকাশ এবং কর্মমুখী শিক্ষা। সেই উপলব্ধিই তাঁকে আজীবন তাড়িত করেছে।
জার্মানিতে অবস্থানকালে তিনি দেখেছিলেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি জাতিও সঠিক শিক্ষা, সংস্কৃতি ও শ্রমনির্ভর দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে কীভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। সেখান থেকেই জন্ম নেয় তাঁর দূরদর্শী স্বপ্ন-বাংলাদেশে এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা হবে কর্মমুখী, সৃজনশীল, প্রযুক্তিনির্ভর এবং সংস্কৃতিবান মানুষ তৈরির উপযোগী। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, ডিগ্রির অহংকার নয়; দক্ষতাই একটি জাতির প্রকৃত শক্তি।
এই বিশ্বাস থেকেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন শান্ত-মারিয়াম ফাউন্ডেশন, শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি, শান্ত-নিকেতন, শান্ত-নিবাসসহ অসংখ্য মানবকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান। তাঁর লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট-দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রযুক্তিনির্ভর কর্মমুখী শিক্ষা পৌঁছে দেওয়া, যাতে তরুণরা অল্প বয়সেই দক্ষ হয়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করতে পারে। একইসঙ্গে তিনি সাংস্কৃতিক শিক্ষাকে সমান গুরুত্ব দিয়েছেন। কারণ তিনি জানতেন, সংস্কৃতিহীন শিক্ষা মানুষকে দক্ষ কর্মী বানাতে পারে, কিন্তু মানবিক মানুষ বানাতে পারে না।
ব্যবসায়ী হিসেবেও তিনি ছিলেন ব্যতিক্রমী। দেশের প্রথম কুরিয়ার কোম্পানি সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিস (প্রাঃ) লিমিটেড প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি শুধু একটি সেবাখাত গড়ে তোলেননি; সৃষ্টি করেছিলেন হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান। কুরিয়ার খাতকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে তাঁর অবদান আজও অনস্বীকার্য। একইভাবে অবহেলিত রপ্তানি খাতকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিষ্ঠিত করেও তিনি দেখিয়েছেন, দূরদৃষ্টি ও সাহস থাকলে সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যায়।
তবে তাঁর সবচেয়ে অনন্য শক্তি ছিল বিনয় ও স্থিতিশীলতার দর্শন। তিনি বিশ্বাস করতেন-“বিলম্বিত লয়ে চলতে হবে, কিন্তু স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে হবে।” আজকের দ্রুত সাফল্যের মোহময় সময়ে এই দর্শন আরো বেশি প্রাসঙ্গিক। কারণ প্রকৃত প্রতিষ্ঠান রাতারাতি গড়ে ওঠে না; সেটি নির্মিত হয় ধৈর্য, সততা, মমত্ব ও মানুষের আস্থার ভিত্তির ওপর।
ইমামুল কবীর শান্ত আজ নেই, কিন্তু তাঁর স্বপ্ন এখনো জীবন্ত। আজকের প্রত্যাশার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মধ্য দিয়ে ২২ মে শুক্রবার তাঁর স্বপ্ন্রে আরেক ধাপ শুরু হলো। তাঁর অসমাপ্ত যুদ্ধ এখনো চলমান-অশিক্ষা, বৈষম্য, সাংস্কৃতিক সংকীর্ণতা ও অর্থনৈতিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে। সেই যুদ্ধের উত্তরাধিকার বহন করার দায়িত্ব এখন তাঁর প্রতিষ্ঠানের উত্তরসূরি, সহযোদ্ধা এবং সমগ্র জাতির। কারণ এমন মানুষ মৃত্যুর মধ্য দিয়েও নিঃশেষ হন না; তাঁরা সময়ের ভেতর দীপশিখার মতো জ্বলতে থাকেন।
সানা/আপ্র/২২/৫/২০২৬