ডা. লেলিন চৌধুরী: প্রথমত বাংলাদেশের সব মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার আগে আমাদের স্বাস্থ্য খাতের বিদ্যমান বাস্তবতাটা বুঝতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কতগুলো মান বা স্ট্যান্ডার্ড রয়েছে। যেমন- প্রতি ১ হাজার লোকের জন্য একজন চিকিৎসক, ৩ জন নার্স এবং ৫ জন টেকনোলজিস্ট বা টেকনিশিয়ান্স থাকবে। এটি হলো প্রাথমিক যে স্বাস্থ্য গ্রুপ ৯ জনের, সেটা। আর যদি বৃহত্তর গ্রুপের কথা বলি, সেক্ষেত্রে ২৩-২৩ জনের গ্রুপ হয়। আমাদের বিদ্যমান যে স্বাস্থ্যব্যবস্থা সেক্ষেত্রে আমরা বৃহত্তর টিমের কথা ভাবছি না প্রাথমিকটার কথা ভাবছি। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিদ্যমান বাস্তবতাটা কী? আমাদের লোকসংখ্যা ১৮ কোটি। এ দেশে চিকিৎসকের সংখ্যা সব মিলিয়ে এক লাখ ৪০ হাজারের মতো। এর মধ্যে বেশ কিছু ডাক্তার মৃত্যুবরণ করেছেন এবং বেশ কিছু ডাক্তার দেশের বাইরে চলে গিয়েছেন। যদি সেই সংখ্যা আমরা ৫ হাজার ধরি, তাহলে বর্তমানে ডাক্তারের সংখ্যা মোট এক লাখ ৩৫ হাজার। এর মধ্যে কতজন রোগী দেখেন, অর্থাৎ ক্লিনিকাল ডক্টর? আমার মতে, ৮৫ বা ৯০ হাজার। বাকিরা, যেমন- রেডিওলজিস্ট, প্যাথলজিস্ট, অ্যানাটমিস্ট, ফিজিওলজিস্ট-যারা রোগী দেখার সঙ্গে যুক্ত না। তাহলে সর্বোচ্চ ৯০ হাজার চিকিৎসক ১৮ কোটি মানুষের জন্য। তার মানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার যে মানদণ্ড, সেটা বাংলাদেশের বাস্তবতায় অনেক অনেক দূরে রয়েছে।
৯০ হাজার চিকিৎসকের জন্য দরকার ২ লাখ ৭০ নার্স। আমাদের আছে সর্বোচ্চ ৬০ থেকে ৬৫ হাজার নার্স। তার মানে রেশিওটা উল্টো হয়ে গিয়েছে, ডাক্তারের চেয়ে নার্স কম। টেকনোলজিস্টের সংখ্যা কত আছে, এটি স্বয়ং সরকারও জানে না। কারণ অনেক পদ খালি রয়েছে। অনেকে পাস করে বসে আছেন, তাদের কাজে লাগানো হচ্ছে না। তারা অন্য পেশায় অনেকে কাজ করছেন। তার মানে স্বাস্থ্যসেবার প্রাথমিক যে টিমটি হবে ৯ জনের, সেখানের চিত্রটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনকভাবে রুগ্ন। এমন অবস্থায় মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার যে বিষয়টি স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, এটি একটি উচ্চ পরিকল্পনার বা আশাবাদের অংশ হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা সেরকম না।
যেমন ধরুন, এর মধ্যে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে হামে আক্রান্ত বেশ কিছু শিশু আইসিইউ’র অপেক্ষা করতে করতে মারা গেছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, ওই হাসপাতালের যিনি পরিচালক তাকে ফাঁসিতে চড়ানো দরকার। এই কথাটি মন্ত্রীর জায়গা থেকে কেমন দায়িত্বশীল কথা, আমি জানি না। কিন্তু তারপরের এবং আগের অংশগুলো আমরা দেখি। হামের টিকা বেশ অনেক দিন যাবৎ বন্ধ। টিকা না থাকার জন্য এবার হামের প্রাদুর্ভাব অনেক বেড়ে গিয়েছে। তাহলে এটার আগে তো হামের টিকা আনার একটা ব্যবস্থা করা উচিত ছিল। স্বাস্থ্যমন্ত্রী কি সে ব্যবস্থা করেছিলেন? আবার আজকে উনি সংসদে বলেছেন, স্বাস্থ্য খাতে কোনো টাকা নাই কিছু কেনার জন্য। তাহলে স্বাস্থ্য খাতে টাকা নাই, এ কারণে কি হামের টিকা আসে নাই? যেহেতু টাকা নাই ওখানকার পরিচালক যিনি, সরাসরি মন্ত্রীকে জানানোর ক্ষমতা রাখেন না, তিনি যদি জানাতেনও তাহলে মন্ত্রী মহোদয় এই আইসিইউর ব্যবস্থা কোত্থেকে করতেন? এই কথাটা তুলে আমরা যেটা বলতে চাই, সেটি হচ্ছে- স্বাস্থ্য খাতে একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা দরকার।
স্বাস্থ্যসেবার পাঁচটি স্তম্ভ। প্রথমটি হচ্ছে প্রমোটিভ হেলথ কেয়ার বা জ্ঞান উন্নয়নমূলক স্বাস্থ্যসেবা। এরপর হচ্ছে প্রিভেন্টিভ হেলথ কেয়ার বা প্রতিরোধী স্বার্থসেবা, মেডিক্যাল কেয়ার বা চিকিৎসাসেবা। তারপরে হচ্ছে রিহ্যাবিটেটিভ হেলথ কেয়ার অর্থাৎ পুনর্বাসনমূলক স্বাস্থ্যসেবা। এরপর উপসমমূলক বা প্যালিয়েটিভ হেলথ কেয়ার। স্বাস্থ্যসেবার এই পাঁচটি স্তম্ভের বিন্যাস আসলে আমাদের দেশে নাই। তাহলে এর বিন্যাসের ওপর ভিত্তি করে স্বাস্থ্যসেবার পরিকল্পনাটা সাজাতে হবে। এবং সেটি করতে গেলে আমাদের কী কী করতে হবে! আমাদের কতজন চিকিৎসক দরকার? সেই চিকিৎসকদের আমরা কত সময়ের মধ্যে গড়ে তুলবো? একটা পরিকল্পনা থাকা দরকার। তার বিপরীতে কতজন নার্স দরকার? তাদের আমরা কত সময়ের মধ্যে গড়ে তুলবো, তার একটি পরিকল্পনা থাকা দরকার। একইভাবে ১৮ কোটি মানুষের দেশে হাসপাতালে কতটি বেড থাকা দরকার, সরকারি বেসরকারি হাসপাতাল সব মিলিয়ে তা নির্ধারণ করা দরকার। প্যালিয়েটিভ বা উপশমমূলক স্বাস্থ্যসেবা কেমন হবে! পুনর্বাসনমূলক স্বাস্থ্যসেবার রূপরেখাটা কী? এগুলোকে সাপোর্ট দেওয়ার জন্য যে ম্যানপাওয়ার বা দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে হবে, সেই শক্তি কীভাবে তৈরি করবে, তার একটা পথরেখা দরকার। সেরকম কোনো লক্ষণ কিন্তু নেই।
বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার প্রধান দুটি অংশ সরকারি এবং বেসরকারি। চিকিৎসাসেবার অংশটি সরকারির চেয়ে বেসরকারি খাতে একটু বেশি দেওয়া হয়। এখন এই বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতকে নজরদারি করার জন্য বিকাশমুখী সহযোগিতা করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে যে পরিমাণ নজরদারি এবং দক্ষ জনশক্তির সহযোগিতা দরকার, সেটার কোনো স্ট্রাকচার তো নাই। তাহলে সেটি করতে হবে। প্রিভেন্টিভ বা প্রতিরোধমূলক যে স্বাস্থ্যসেবা, সেখানেও তো অনেক কাজ করতে হবে। আমাদের দেশের মানুষ অনেকে এখনও মনে করেন-বাতাস লেগে পেটে ব্যথা হয়েছে। খারাপ বাতাসের কারণে জিনে বা ভূতে ধরেছে। এখন এই জাতীয় কুসংস্কার থেকে মানুষকে মুক্ত করে স্বাস্থ্যসেবা খাতকে উন্নয়নের জন্য যা যা করতে হবে, সেই জ্ঞানগুলো তো মানুষকে দিতে হবে। নয়তো মানুষ নিজের ওপরে যে দায়িত্ব, সেই জায়গাটাই বুঝতে পারবে না। আজকের দিনে মানুষকে বলা হয়, স্বাস্থ্যসেবাটা মানুষের জন্য। মানুষের মাধ্যমে সেবা আয়োজন করতে হবে। এবং সেক্ষেত্রে সরকার সহযোগী বা ফ্যাসিলেটেটিভ পাওয়ার হবে। এখন একটা মানুষকে যদি স্বাস্থ্যসেবার মূল বিষয়টা আমি না জানাই, জ্বর হলে একটি প্যারাসিটামল খেতে হবে, অথবা ডায়রিয়া হলে কী পরিমাণে ওরস্যালাইন খেতে হবে, অথবা কখন ডাক্তারের কাছে যেতে হবে- কখন যেতে হবে না, একজন নারী অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পরে সে পুরো গর্ভধারণের সময় কয়বার ডাক্তারের কাছে যাবে, তার প্রসবের যে পরিকল্পনা, তা সে কীভাবে করবে, এগুলো তো মানুষকে শেখাতে হবে। এই জ্ঞানগুলো তো মানুষকে দিতে হবে, সেটা করতে কার্যকর উদ্যোগ তো কম রয়েছে। তারপর ধরুন, একটি রোগী কমিউনিটি ক্লিনিকে গেলো, সেখান থেকে তাকে রেফার করা হলো উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে, সেখানে যাওয়ার পর তাকে হয়তো জেলা হাসপাতালে রেফার করা হলো। উপজেলা থেকে জেলা হাসপাতালে কীভাবে আসবে, তার একটা ব্যবস্থা থাকতে হবে। সেই অ্যাম্বুলেন্স সেবা টাকা দিয়ে হোক, না দিয়ে হোক, সে যদি জেলা হাসপাতালে আসে, তাহলে জেলা হাসপাতাল তাকে পূর্ণাঙ্গ সেবা দেওয়ার দায়িত্ব নিতে হবে। অথবা যদি টারশিয়ারি যুগের বা তৃতীয় স্তরের উন্নততর হাসপাতালে ঢাকা মেডিক্যালে বা বাংলাদেশ মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটিতে পাঠাতে হয়-সেখানেও সেই রেফারেন্সের গুরুত্ব দিতে হবে। অর্থাৎ এই কার্যকরী রেফারেন্স ব্যবস্থাই গড়ে ওঠেনি। তাহলে সেটা তো গড়ে তুলতে হবে।
চিকিৎসক এবং নার্সদের মধ্যে একটি প্রবণতা রয়েছে- যেহেতু তারা যে বিজ্ঞানের বইগুলো পড়াশোনা করে, সেগুলো ইউরোপ বা আমেরিকাতে তৈরি হয়। সে বইয়ের মধ্যে অনেক কিছুই থাকে ইউরোপ বা আমেরিকাকেন্দ্রিক। সে জায়গা থেকে দেশীয়কেন্দ্রিক, দেশের সংস্কৃতি প্রকৃতি পরিবেশ, দেশের মানুষের স্বভাব আচরণ নৃতাত্ত্বিক বিকাশ সব কিছুর সঙ্গে সমন্বয় করে চিকিৎসা বিজ্ঞানকে এ দেশের মতো করতে হবে। তারও একটা পরিকল্পনা থাকা দরকার। এগুলো না থাকলে স্বাস্থ্যসেবা বা চিকিৎসাসেবা কোনোটাই পরিপূর্ণ হবে না। সেই জায়গাতে কাজ করতে হবে। এই কাজ করতে হলে একটা পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য পরিকল্পনা দরকার। সেটি এখন দেশে নাই, সে কাজটি করা দরকার।
দেখুন, প্রায় দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে বাজেটে জিডিপির এক শতাংশের কম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, জিডিপির পাঁচ শতাংশের মতো বরাদ্দ দেওয়া উচিত। বর্তমান যে সরকার ক্ষমতায় রয়েছে, তারাও তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে কিন্তু স্বাস্থ্য খাতে ৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার কথা বলেছে। কথাটা চমৎকার বলেছে। কিন্তু বর্তমান স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যে শক্তি রয়েছে, সে শক্তিতে জিডিপির এক শতাংশের কম যে বাজেট, এটাকেই তারা কাজে লাগাতে পারে না। তাহলে পাঁচ শতাংশ দূরের কথা, ২ শতাংশ যদি দেওয়া হয়, কীভাবে কাজে লাগাবে? তাহলে সামর্থ্যের বিস্তৃতি ঘটাতে হবে। সেই বিস্তৃতি ঘটানোর জন্য এখন পর্যন্ত কোনো পরিকল্পনা নাই। তাহলে সেই পরিকল্পনাগুলো করতে হবে।
আমরা কোভিডের সময় দেখেছি, আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার রুগ্ন রূপ। তৎকালীন সরকারের নীতি নির্ধারকদের মধ্যে প্রথম নির্বাহী থেকে শুরু করে বাকিরা সমস্বরে বলেছে-তারা দ্রুত এটি সমাধানে ব্যবস্থা নেবে, কিন্তু সেই ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আমরা পরবর্তীকালে কোনো পরিকল্পনা দেখিনি। অন্তর্বর্তী সরকারকেও দেখিনি এবং বর্তমান সরকার এরকম কোনো পরিকল্পনা নেবে কিনা, তারও কোনো ইঙ্গিত বা পূর্বাভাস আমরা পাইনি। তাহলে এই জায়গাটায় কাজ করতে হবে। অর্থাৎ যদি সত্যিকার অর্থেই প্রতিটি মানুষের ঘরে ঘরে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার দরকার হয়-তাহলে আমাদের একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবার যে পাঁচটি স্তম্ভ থাকবে, সে অনুযায়ী একটা পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। সে অনুযায়ী আমাদের দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার একটা পরিকল্পনা করতে হবে। সে অনুযায়ী বাজেট বরাদ্দটা করতে হবে। সে বাজেটকে কাজে ব্যবহার করার উপযোগী একটি স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো বা মন্ত্রণালয় গড়ে তুলতে হবে। এই কাজগুলো না করে আমরা যদি শুধু বলি যে ঘরে ঘরে মানুষের জন্য সেবা পৌঁছে দেবো, তাহলে সেটি কথার কথা হয়ে থেকে যাবে।
লেখক: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ
সানা/আপ্র/৮/৫/২০২৬