কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে দেশের পশুর হাটগুলোতে এখন জমজমাট বেচাকেনা শুরু হলেও ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে দাম নিয়ে টানাপোড়েন এবং বৃষ্টিজনিত দুর্ভোগ একসঙ্গে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন হাটে একদিকে উৎসবের আমেজ, অন্যদিকে ক্রয়ক্ষমতা, দাম ও জলাবদ্ধতা মিলিয়ে তৈরি হয়েছে মিশ্র পরিস্থিতি।
দরকষাকষিতে বাজারে চাপ: রাজধানীর মিরপুরের কালশী, পোস্তগোলা ও ধোলাইখালসহ বিভিন্ন পশুর হাটে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত থেমে থেমে বৃষ্টির মধ্যেও ক্রেতা ও বিক্রেতার উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। তবে বেশিরভাগ ক্রেতাই পশু ঘুরে দেখছেন, দরদাম করছেন, কিন্তু চূড়ান্ত কেনাকাটায় ধীরগতি দেখা যাচ্ছে।
ছোট ও মাঝারি আকারের গরুর চাহিদা বেশি থাকলেও দাম তুলনামূলক বেশি হওয়ায় ক্রেতাদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। অন্যদিকে বিক্রেতারা বলছেন, পশুখাদ্য, পরিবহন ও লালন-পালনের খরচ বেড়ে যাওয়ায় দাম বেশি রাখতে হচ্ছে।
কালশী হাটের বিক্রেতা সাইফুল শেখ বলেন, ক্রেতারা প্রতি গরুতে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত কম দাম বলছেন, যা বর্তমান ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একই হাটের আরেক বিক্রেতা আবদুল গফুরও লোকসানের শঙ্কার কথা জানান।
অন্যদিকে ক্রেতারা বলছেন, বাজারে পশুর দাম অস্বাভাবিকভাবে বেশি চাওয়া হচ্ছে। ফলে অনেকেই একাধিক হাট ঘুরে তুলনামূলক সাশ্রয়ী পশু খুঁজছেন।
বড় গরুতে অনিশ্চয়তা, নামকরণে কৌতূহল: হাটগুলোতে বড় আকৃতির গরুর প্রতি ভিড় বেশি হলেও বিক্রি তুলনামূলক কম দেখা গেছে। টাঙ্গাইল ও সাভার থেকে আনা বড় গরুর দাম কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত হাঁকা হলেও ক্রেতারা দর কম দিতে চাইছেন, ফলে দরদামে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এদিকে হাটে পশুর নামকরণেও কৌতূহল তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিনসহ বিভিন্ন সেলিব্রিটির নামে গরুর নাম রাখা হচ্ছে। বিক্রেতাদের দাবি, এতে ক্রেতাদের আকর্ষণ বাড়ে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের ফলে বিক্রি বাড়ে।
শনির আখড়া হাটে জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ: টানা বৃষ্টির কারণে রাজধানীর শনির আখড়া পশুর হাটে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। হাটের বিভিন্ন অংশে পানি ও কাদা জমে ক্রেতা–বিক্রেতা এবং পশুরা চরম দুর্ভোগে পড়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, হাটের ভেতরের বেশিরভাগ অংশ কর্দমাক্ত হয়ে গেছে এবং কোথাও কোথাও পানি জমে ছোট ডোবায় পরিণত হয়েছে। বিক্রেতারা খড় ও বালু ফেলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও স্বস্তি মিলছে না।
জামালপুরের ব্যবসায়ী হাসেম জানান, তিনি ১৫টি গরু নিয়ে আসলেও এখনো অনেকগুলো অবিক্রীত রয়েছে। ফরিদপুরের ব্যবসায়ী সিদ্দিক মৃধা জানান, দুই দিনেও একটি গরুও বিক্রি হয়নি। ক্রেতা আবদুল হামিদ বলেন, কাদা ও পানির কারণে হাঁটা–চলাও কষ্টকর হয়ে পড়েছে।
মন্দার ছায়া: প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে দেশে কোরবানির পশু জবাইয়ের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমছে। গত বছর প্রায় ৯১ লাখ পশু কোরবানি হয়েছিল, যা আগের বছরের তুলনায় কম।
চলতি বছর কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা ১ কোটি ২৩ লাখের বেশি হলেও চাহিদা প্রায় ১ কোটি ১ লাখ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, এবার কোরবানির সংখ্যা আরও কমে যেতে পারে।
অর্থনৈতিক মন্দা, মূল্যস্ফীতি এবং ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসকে এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। ফলে অনেকেই একক পশুর বদলে ভাগে কোরবানি দিচ্ছেন বা ছোট পশুর দিকে ঝুঁকছেন।
শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রিপন কুমার মণ্ডল বলেন, মধ্যবিত্তদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় কোরবানির বাজারে সরাসরি প্রভাব পড়ছে।
বাংলাদেশ ডেইরি অ্যান্ড ফ্যাটেনিং ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন বলেন, মৌসুমে পশু বিক্রি না হলে খামারিরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েন।
বিভিন্ন হাটে মিশ্র চিত্র: রাজধানীর শাহজাহানপুর হাটসহ বিভিন্ন স্থানে ক্রেতারা বলছেন, শুরু থেকেই বাজার চড়া। অনেকেই গরুর দাম প্রত্যাশার তুলনায় বেশি হওয়ায় কিনতে পারছেন না।
সব মিলিয়ে কোরবানির পশুর হাটে একদিকে উৎসবমুখর পরিবেশ থাকলেও অন্যদিকে দাম, বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে টানাপোড়েন ও ভোগান্তি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
সানা/আপ্র/২৫/৫/২০২৬