প্রকৃতির রুদ্ররূপ থেকে সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী, বিশেষ করে রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে রক্ষায় নতুন উদ্যোগ নিয়েছে বন বিভাগ। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও উচ্চ জোয়ারের পানিতে বন্যপ্রাণীর প্রাণহানি ঠেকাতে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় নির্মাণ করা হয়েছে ২০টি উঁচু টিলা। এসব টিলার পাশে খনন করা হয়েছে মিঠাপানির পুকুর, যেখানে বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানি জমা থাকবে এবং শুষ্ক সময়ে প্রাণীদের জন্য তা হয়ে উঠবে পানির উৎস।
সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় পানি বেড়ে গেলে অনেক স্থান তিন ফুট পর্যন্ত পানির নিচে তলিয়ে যায়। এতে হরিণ, বাঘসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে বিপাকে পড়ে। আবার লবণাক্ত পানি প্রাণীদের জন্য তৈরি করে বড় ধরনের ঝুঁকি। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বনের ভেতরে উঁচু আশ্রয়স্থল তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
খুলনা বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনে ৩৫ কোটি ৯০ লাখ ৮০ হাজার টাকা ব্যয়ে ২০২২ সালের এপ্রিল মাসে সুন্দরবন বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। প্রকল্পের আওতায় বাঘ জরিপ এবং বাঘ সংরক্ষণ-দুই ধরনের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়ানো হয় এবং চলতি বছরের মার্চে এর কার্যক্রম শেষ হয়েছে।
এই প্রকল্পের আওতায় সুন্দরবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মোট ২০টি টিলা নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম দুই বছরে ১২টি এবং চলতি বছরে আরো আটটি টিলার নির্মাণকাজ শেষ হয়। প্রতিটি টিলা প্রায় ৫০ মিটার দীর্ঘ এবং তিন মিটার উঁচু। পুকুর খননের মাটি দিয়েই এসব টিলা তৈরি করা হয়েছে।
বন বিভাগ জানায়, সুন্দরবনের চাঁদপাই, শরণখোলা, খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জে তিনটি করে মোট ১২টি টিলা নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া খুলনা রেঞ্জের নীলকমল অভয়ারণ্য কেন্দ্র, পাটকোস্ট, ভোমরণালী, সাতক্ষীরা রেঞ্জের পুষ্পাকাটি, মান্দারবাড়িয়া ও নোটাবেকীসহ চাঁদপাই ও শরণখোলা রেঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় আরো টিলা তৈরি করা হয়েছে। প্রতিটি টিলার পাশেই রয়েছে মিঠাপানির পুকুর।
বন কর্মকর্তারা বলছেন, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপ, পূর্ণিমার জোয়ার ও অতিবৃষ্টির কারণে সুন্দরবনের অনেক এলাকা পানিতে প্লাবিত হয়। এ সময় বন্যপ্রাণীরা এসব উঁচু টিলায় আশ্রয় নিতে পারবে। পাশাপাশি পুকুরের সংরক্ষিত মিঠাপানি শুষ্ক মৌসুমে তাদের পানির চাহিদা পূরণ করবে।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ও বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্পের পরিচালক এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিষয়টি মাথায় রেখেই বনের অভ্যন্তরে বিভিন্ন স্থানে উঁচু টিলা তৈরি করা হয়েছে। পানি বাড়লে বন্যপ্রাণীরা এসব টিলায় আশ্রয় নিতে পারবে। টিলাগুলো সংরক্ষণে বন বিভাগ নিয়মিত কাজ করছে।
তিনি বলেন, সুন্দরবনে হরিণের সংখ্যাও বেড়েছে। বন্যপ্রাণীর নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সংরক্ষণ কার্যক্রম আরো জোরদার করা হচ্ছে।
তবে পরিবেশবিদরা বলছেন, সুন্দরবনের মতো বিশাল বনাঞ্চলের জন্য ২০টি টিলা যথেষ্ট নয়। আরো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এ ধরনের নিরাপদ আশ্রয়স্থল নির্মাণের প্রয়োজন রয়েছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের খুলনা শাখার সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, টিলা নির্মাণ ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে এসব পুকুরে যাতে জলোচ্ছ্বাসের লবণাক্ত পানি প্রবেশ করতে না পারে, সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, শুধু টিলা ও পুকুর তৈরি করলেই হবে না, এগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণও প্রয়োজন। গহিন অরণ্যের এসব এলাকায় মানুষের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং শব্দ ও পরিবেশ দূষণ বন্ধ করতে হবে।
পরিবেশবিদদের মতে, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আরো বেশি নিরাপদ আশ্রয়স্থল তৈরি, বন সংরক্ষণ আইন কার্যকর করা এবং অভয়ারণ্য এলাকার সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। তাহলেই প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় বাঘসহ সুন্দরবনের প্রাণীরা আরো নিরাপদে টিকে থাকতে পারবে।
সানা/ডিসি/আপ্র/১৫/৭/২০২৬