খান মহঃ আশরাফুল আলম
খেলাধুলায় জয় ও পরাজয়- দুটিই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। মাঠে যারা শ্রেয়তর কৌশল প্রদর্শন করেন এবং স্নায়ুচাপ ধরে রাখতে পারেন- শেষ পর্যন্ত জয়মাল্য তাদের গলাতেই ওঠে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ব ফুটবলে এক অদ্ভুত ও নেতিবাচক প্রবণতা মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। তা হলো, ম্যাচ হারলেই তার দায়ভার রেফারি কিংবা ম্যাচ অফিশিয়ালদের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে হাইভোল্টেজ ম্যাচে হারের পর মিসরীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ও তাদের ক্রীড়ামোদীদের পক্ষ থেকে যে ‘পক্ষপাতিত্ব’-এর অভিযোগ তোলা হয়েছে, তা মূলত ওই সংস্কৃতিরই এক নতুন ও অনভিপ্রেত সংস্করণ। মিসরীয় শিবির থেকে ম্যাচ পরিচালকদের দিকে যে আঙুল তোলা হয়েছে, তা ঠাণ্ডা মাথায় এবং ফুটবলের নিয়ম-কানুনের আলোকেই বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে- এই অভিযোগ যতটা না যৌক্তিক বা তথ্য-প্রমাণনির্ভর, এর চেয়ে অনেক বেশি ম্যাচ হারের হতাশা ও ক্ষোভ ঢাকার একটি ব্যর্থ চেষ্টা। নির্মোহ দৃষ্টিতে দেখলে মিসরের এই পক্ষপাতের অভিযোগ পুরোপুরি ‘ভিত্তিহীন’ ও ফুটবলের মূল চেতনার পরিপন্থী।
আধুনিক ফুটবল এখন আর কেবল মাঠের তিনজন রেফারির চোখ বা সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল নয়। প্রযুক্তির অভাবনীয় উৎকর্ষের এই যুগে প্রতিটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ পরিচালিত হয় ‘ভিএআর’ (ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি) এবং একাধিক হাই-টেক ক্যামেরার কঠোর নজরদারিতে। যেখানে একটি অফসাইড কিংবা পেনাল্টির সিদ্ধান্ত মিলিমিটারের মাপে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়, সেখানে কোনো রেফারি বা রেফারি প্যানেলের পক্ষে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কোনো নির্দিষ্ট পরাশক্তির পক্ষে কাজ করা কিংবা ‘পক্ষপাতিত্ব’ করা কার্যত অসম্ভব। মিসরীয় ফুটবলকর্তারা যেসব সিদ্ধান্তকে তাদের বিপক্ষে গেছে বলে শোরগোল তুলছেন, তার প্রতিটিই ফুটবলের প্রতিষ্ঠিত নিয়মাবলির ভেতরে থেকেই নেওয়া হয়েছে। মাঠে একজন রেফারিকে সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। ওই সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে ১-২টি ক্ষেত্রে মানবিক ভুল বা ‘হিউম্যান এরর’ হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়; যা ফুটবলের ইতিহাসেরই অংশ। কিন্তু ওই স্বাভাবিক মানবিক ভুলকে যখন ‘পরিকল্পিত’ বা ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পক্ষপাতিত্ব’ হিসেবে রঙ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, তখন তা কেবল রেফারির সততাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে না; বরং ফুটবলের বৈশ্বিক স্পোর্টিং স্পিরিট বা খেলোয়াড়সুলভ মনোভাবকেও কালিমালিপ্ত করে।
মিসর ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার ম্যাচটির দিকে তাকালে দেখা যাবে, প্রথমার্ধ থেকেই ম্যাচটি ছিল অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও শারীরিক শক্তিনির্ভর। এমন হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে রেফারিকে শুরু থেকেই কঠোর হস্তে খেলা নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, অন্যথায় ম্যাচটি যে কোনো সময় সহিংস রূপ নিতে পারত। রেফারি ঠিক এ কাজটিই করেছেন। তিনি ফাউল ও কার্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে ফুটবলের নিয়ম কঠোরভাবে প্রয়োগ করেছেন। মিসরীয় শিবিরের মূল ক্ষোভ হয়তো নির্দিষ্ট কোনো পেনাল্টি বা ফাউলের সিদ্ধান্ত নিয়ে। কিন্তু রিপ্লে ও নিরপেক্ষ ফুটবল বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ বলছে, রেফারি এবং ভিএআর কক্ষের সিদ্ধান্তগুলো ফিফার নির্দেশিকা মেনেই নেওয়া হয়েছিল। যদি রেফারি সত্যিই আর্জেন্টিনার প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট হতেন, তাহলে ম্যাচের অনেক ক্রুসিয়াল মুহূর্তে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের ফাউলগুলো তিনি এড়িয়ে যেতেন- যা তিনি করেননি। তিনি নিয়মের ক্ষেত্রে দু’দলকেই সমান চোখে দেখেছেন।
আসলে ফুটবল মাঠে মিসরের পরাজয়ের মূল কারণ রেফারি ছিলেন না; ছিল তাদের নিজেদের কৌশলগত ব্যর্থতা এবং ম্যাচের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অন্তিম মুহূর্তে মনোযোগ হারানো। ম্যাচজুড়ে আর্জেন্টিনা তাদের চিরচেনা আক্রমণাত্মক, গতিশীল ও নিয়ন্ত্রিত ফুটবল খেলে ম্যাচটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল। অন্যদিকে মিসর বেশকিছু চমৎকার সুযোগ তৈরি করলেও চূড়ান্ত মুহূর্তে ফিনিশিংয়ের চরম অভাবে গোল পেতে ব্যর্থ হয়েছে। একই সঙ্গে তাদের রক্ষণভাগের ট্যাকটিক্যাল ভুল ও ডিফেন্ডারদের সমন্বয়হীনতার সুযোগ নিয়েই আর্জেন্টিনা গোল আদায় করেছে। নিজের ঘরের এই স্পষ্ট দুর্বলতা ও ফুটবলারদের মাঠের ভুলগুলো আড়াল করে রেফারির বাঁশির দিকে আঙুল তোলা কেবল আত্মপ্রবঞ্চনাই নয়; বরং মিসরীয় ফুটবলের দীর্ঘমেয়াদি উন্নতির পথকেও রুদ্ধ করে দেওয়া। হারের পর যদি ভুলগুলো নিয়ে আত্মসমালোচনা না করে অন্যকে দোষারোপ করা হয়, তাহলে খেলোয়াড়রা নিজেদের খামতিগুলো কখনোই শুধরে নিতে পারে না।
অতীতের বহু আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টেই দেখা গেছে, যখনই কোনো মাঝারি বা উদীয়মান দল ফুটবলের কোনো প্রতিষ্ঠিত পরাশক্তির মুখোমুখি হয় এবং পরাজিত হয়, তখন তাদের মধ্যে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ‘ভিকটিম কমপ্লেক্স’ বা অন্যায় আচরণের শিকার হওয়ার মানসিকতা কাজ করে। তারা ধরে নেয়, রেফারি বা আয়োজকরা সব সময় বড় দলগুলোকেই জেতাতে চায়। মিসর এবার ঠিক এই মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদেই পা দিয়েছে। আর্জেন্টিনার মতো বিশ্বজয়ী দলের বিপক্ষে হার মেনে নেওয়াটা মানসিকভাবে কঠিন হতে পারে। কিন্তু ওই হারের অজুহাত হিসেবে রেফারিকে ঢাল বানানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মিসরীয় মিডিয়া ও ফুটবল সংশ্লিষ্টরা রেফারির সিদ্ধান্তকে একপেশে প্রমাণের জন্য ম্যাচের কিছু নির্দিষ্ট খণ্ডিত ভিডিও ক্লিপ বা স্থিরচিত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু ওই খণ্ডিত চিত্রগুলো দিয়ে পুরো ৯০ মিনিটের মাঠের সত্যকে আড়াল করা বা অস্বীকার করা যায় না। এই ধরনের ভিত্তিহীন অভিযোগ ফুটবলের সার্বিক শৃঙ্খলার জন্যও এক বিরাট হুমকি।
মাঠের ভেতরে রেফারিই চূড়ান্ত আইন- এই সনাতন ও অকৃত্রিম নিয়মকে যদি দলগুলো তাদের ইচ্ছামতো প্রশ্নের মুখোমুখি করতে থাকে, তাহলে মাঠের শৃঙ্খলা এবং রেফারিদের নিরাপত্তা ভেঙে পড়বে। রেফারিরাও মানুষ। তাদেরও ভুল হতে পারে। ওই ভুলের জন্য ফিফার নিজস্ব মূল্যায়ন পদ্ধতি ও রিভিউ কমিটি রয়েছে। কিন্তু ম্যাচ শেষেই আনুষ্ঠানিকভাবে রেফারিকে ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ বা ‘স্বার্থান্বেষী’ বলে দাগিয়ে দেওয়া এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক গুণ্ডামির শামিল। আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থাগুলোর উচিত এই ধরনের ঢালাও ও প্রমাণহীন অভিযোগের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা- যাতে ভবিষ্যতে কোনো দল হারের পর রেফারিকে এভাবে বলির পাঁঠা বানাতে না পারে।
পরিশেষে বলা যায়, মিসরের ফুটবলকর্তাদের উচিত এখন অভিযোগের খেরোখাতা বন্ধ করে নিজেদের মাঠের পারফরম্যান্সের দিকে নজর দেওয়া। রেফারির বাঁশিকে কাঠগড়ায় না দাঁড়িয়ে যদি তারা মিডফিল্ডের দুর্বলতা ও স্ট্রাইকারদের গোল মিসের মহড়া নিয়ে কাটাছেঁড়া করেন, তাহলেই সেটি মিসরীয় ফুটবলের জন্য মঙ্গলজনক হবে। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচটি তাদের জন্য একটি বড় শিক্ষা হতে পারত। কিন্তু পক্ষপাতের ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে তারা ওই শিক্ষার সুযোগটি হাতছাড়া করেছে। হারের দায় অন্যের ঘাড়ে চাপানো সাময়িক সান্ত্বনা বা সস্তা সহানুভূতি এনে দিতে পারে। কিন্তু তা কখনো দীর্ঘমেয়াদে কোনো দলকে বিজয়ী হিসেবে গড়ে তোলে না। মাঠের জবাব মাঠেই দিতে হয়। এ জন্য প্রয়োজন যোগ্যতা; রেফারিকে দোষারোপ করার সস্তা প্রবণতা নয়।
লেখক: সাংবাদিক ও বিশ্লেষক
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)
কেএমএএ/আপ্র/১৩.০৭.২০২৬