বৃষ্টির পানিকে অনেকেই প্রকৃতির বিশুদ্ধ পানীয় হিসেবে বিবেচনা করেন। অনেকে মনে করেন মেঘ থেকে ঝরে পড়া এই পানি ঘরের ফিল্টারের পানির মতোই স্বচ্ছ ও জীবাণুমুক্ত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আকাশ থেকে নিচে পড়ার সময় বৃষ্টির পানি বায়ুমণ্ডলের অসংখ্য ধূলিকণা, ধোঁয়া ও জীবাণুর সংস্পর্শে এসে দূষিত হয়ে পড়ে। সিডিসির মতো আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো বৃষ্টির পানি সরাসরি পান করা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেয়। কারণ এতে নানা রকম ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও ক্ষতিকর উপাদান মিশে থাকে।
কেন বৃষ্টির পানি পান করা ঝুঁকিপূর্ণ: বৃষ্টির পানি সংগ্রহের পদ্ধতিটিই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ছাদ থেকে পাইপ বা খোলা পাত্রের মাধ্যমে পানি জমালে তাতে পাখির বিষ্ঠা, গাছের পচা পাতা, ধুলাবালি এমনকি পুরোনো পাইপ থেকে সিসা বা তামার মতো বিষাক্ত ধাতু মিশে যেতে পারে। এ ছাড়া খোলা পাত্রে পানি জমিয়ে রাখলে তাতে মশা ও অন্যান্য পতঙ্গের বংশবিস্তারের আশঙ্কা থাকে। যদিও অনেক ক্ষেত্রে পানি ফুটিয়ে বা আধুনিক ফিল্টারে পরিশোধন করলে সাধারণ ময়লা দূর করা সম্ভব। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানের নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে এক ভয়ংকর তথ্য।
চিরস্থায়ী রাসায়নিক বা পিএফএএস ঝুঁকি: ২০২২ সালে ‘এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় জানা গেছে, পৃথিবীর সর্বত্র বৃষ্টির পানিতে ‘পিএফএএস’ নামের মানুষের তৈরি ক্ষতিকর রাসায়নিকের মাত্রা নিরাপদ সীমার চেয়ে অনেক বেশি।
স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ রসায়নবিদ ইয়ান কাজিন্স-এর মতে, এই পিএফএএস হলো ১৪০০-এর বেশি রাসায়নিকের মিশ্রণ, যা ওয়াটারপ্রুফ পোশাক, ননস্টিক হাঁড়ি-পাতিল ও খাবারের প্যাকেটে ব্যবহৃত হয়। এগুলো সহজে ধ্বংস হয় না বলে এদের ‘চিরস্থায়ী রাসায়নিক’ বলা হয়।
স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব: বিজ্ঞানীদের মতে, এই রাসায়নিকগুলো অত্যন্ত বিষাক্ত এবং মানবদেহে প্রবেশ করলে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এর প্রভাবে ক্যানসার, লিভারের সমস্যা, থাইরয়েডের রোগ এবং শিশুদের স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। এমনকি এটি শিশুদের টিকার কার্যকারিতাও কমিয়ে দিতে পারে। উদ্বেগের বিষয় হলো, তিব্বত মালভূমি কিংবা অ্যান্টার্কটিকার মতো দুর্গম এলাকার বৃষ্টির পানিতেও এই রাসায়নিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
পানি শোধন যথেষ্ট নয়: সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, বৃষ্টির পানি ফুটিয়ে বা সাধারণ পদ্ধতিতে শোধন করলেও এই চিরস্থায়ী রাসায়নিক বা পিএফএএস পুরোপুরি দূর করা সম্ভব হয় না। যদিও নদী বা সমুদ্রে গেলে এর ঘনত্ব ধীরে ধীরে কমে আসে, তবুও এই প্রাকৃতিক শোধন প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীরগতির। তাই বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে বৃষ্টির পানি সরাসারি পান করা বর্তমানে একেবারেই নিরাপদ নয়। আধুনিক জীবনযাত্রার দূষণ এখন এতটাই বিস্তৃত যে, বৃষ্টির পানি পানের উপযোগী কি না—তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। তাই স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে প্রচলিত নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানির উৎসের ওপর নির্ভর করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
কেএমএএ/আপ্র/১৩.০৭.২০২৬