গত পাঁচ দশকে বিশ্বজুড়ে পুরুষদের দেহে টেস্টোস্টেরনের গড় মাত্রা প্রায় অর্ধেক কমে গেছে বলে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে। পুরুষের প্রজনন সক্ষমতা, সামগ্রিক স্বাস্থ্য এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তন নিয়ে বিশ্বজুড়ে চলমান আলোচনায় এ তথ্যকে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে দেখছেন বিজ্ঞানীরা।
লন্ডনে অনুষ্ঠিত মানব প্রজনন ও ভ্রূণবিজ্ঞানের ইউরোপীয় সংগঠনের বার্ষিক সভায় উপস্থাপিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৯৭২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সময়ে পুরুষদের দেহে মোট টেস্টোস্টেরনের মাত্রা প্রায় ৫৪ শতাংশ কমেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০০ সালের পর এই হ্রাসের গতি আরো বেড়েছে।
গবেষণাটি তৈরি করতে আগের ছয়টি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার তথ্য একত্র করা হয়েছে। এসব গবেষণায় ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, ফিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের ১ লাখ ১৮ হাজার ৫৯৩ জন পুরুষের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।
গবেষকদের মতে, টেস্টোস্টেরন কমে যাওয়ার পেছনে স্থূলতা, অতিরিক্ত ওজন, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন জীবনযাপনজনিত কারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি পরিবেশগত কিছু কারণও এ সমস্যাকে বাড়িয়ে তুলছে বলে ধারণা করছেন তাঁরা।
বিশেষ করে গৃহস্থালি পণ্য ও বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদানে থাকা হরমোনের কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টিকারী উপাদান এবং বৈশ্বিক উষ্ণতার মতো বিষয়গুলো পুরুষের হরমোন ভারসাম্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন।
ইসরায়েলের হিব্রু ইউনিভার্সিটির জনস্বাস্থ্য বিভাগের অধ্যাপক হাগাই লেভিন বলেন, পুরুষের প্রজনন স্বাস্থ্য বর্তমানে একটি বড় সংকটের মুখে পড়েছে। তাঁর মতে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা অর্ধেকের বেশি কমে যাওয়া কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং এটি দীর্ঘদিন ধরে চলা একটি স্পষ্ট প্রবণতা।
এর আগে একই গবেষক দলের এক গবেষণায় গত চার দশকে পুরুষদের শুক্রাণুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়ার তথ্য উঠে এসেছিল। ফলে পুরুষের প্রজনন সক্ষমতা কমে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে নতুন করে বৈজ্ঞানিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এ বিষয়ে সব বিজ্ঞানী একমত নন। লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের প্রজনন হরমোন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক চন্না জয়েসেনা মনে করেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে আরো গবেষণা প্রয়োজন। তাঁর মতে, স্থূলতা ও ডায়াবেটিসের মতো স্বাস্থ্যগত সমস্যাই টেস্টোস্টেরন কমার বড় কারণ হতে পারে।
পুরুষের শরীরে টেস্টোস্টেরন শুধু প্রজনন ক্ষমতার সঙ্গেই যুক্ত নয়; এটি পেশি গঠন, হাড়ের ঘনত্ব, যৌন আকাঙ্ক্ষা, শক্তির মাত্রা, মেজাজ এবং বিপাকক্রিয়াতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই এই হরমোনের দীর্ঘমেয়াদি পতন সার্বিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
গবেষকরা বলছেন, টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে যাওয়ার পেছনে স্থূলতা ও বিপাকীয় জটিলতার প্রভাব বড় হলেও পরিবেশগত কারণগুলোর ভূমিকা কতটা, তা নিশ্চিত করতে আরো বিস্তারিত গবেষণা প্রয়োজন।
অধ্যাপক লেভিনের মতে, প্রজনন স্বাস্থ্য মানুষের সার্বিক স্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। পরিবর্তিত জীবনধারা, পরিবেশ দূষণ, ক্ষতিকর রাসায়নিকের সংস্পর্শ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মানুষের ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
বিজ্ঞানীদের এই সতর্কবার্তা শুধু পুরুষের প্রজনন স্বাস্থ্য নয়, আধুনিক জীবনযাত্রার সামগ্রিক প্রভাব নিয়েও নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।
সানা/কেএমএএ/আপ্র/১৩/৭/২০২৬