গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে আলোচিত রাম বিগ্রহ নির্মাণ উদ্যোগের উদ্যোক্তা হরিদাস চন্দ্র তরণী দাসকে অর্থপাচারের মামলায় চার দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। প্রায় ৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকার সন্দেহজনক লেনদেন, হুন্ডি ও সংঘবদ্ধ অপরাধের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এ রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়।
সোমবার (১৩ জুলাই) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রিপন হোসেন তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ আদেশ দেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী কবীর হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে রোববার রাতে গাইবান্ধা জেলা পুলিশের সহায়তায় পলাশবাড়ী উপজেলার মধ্য রামচন্দ্রপুর গ্রামের রাধাগোবিন্দ ও কালীমন্দির এলাকা থেকে হরিদাসকে গ্রেফতার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ। একই দিন রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানায় সিআইডির আর্থিক অপরাধ ইউনিটের উপপরিদর্শক সাইফুল ইসলাম তাঁর বিরুদ্ধে অর্থপাচার প্রতিরোধ আইনে মামলা করেন।
সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বৈধ আয়ের কোনো গ্রহণযোগ্য উৎস না থাকলেও হরিদাসের বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব ও মুঠোফোনভিত্তিক আর্থিক সেবার হিসাবে ৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকা জমা হয়েছে। প্রায় সমপরিমাণ অর্থ পরবর্তী সময়ে উত্তোলনও করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বহু ব্যক্তি তাঁর হিসাবে বিপুল অঙ্কের অর্থ জমা দিয়েছেন, যা তাঁর ঘোষিত পেশা ও আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মনে করছে তদন্ত সংস্থা।
সিআইডি আরো জানিয়েছে, হরিদাসের বিরুদ্ধে প্রতারণা, হুন্ডি, দেশি-বিদেশি মুদ্রা পাচার এবং সংঘবদ্ধ অপরাধে সম্পৃক্ততার অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের উৎস ও অর্থের গন্তব্য নিয়ে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
সোমবার তাঁকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক কে এম রাকিবুল হুদা। শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করলে আসামিপক্ষ জামিন চেয়ে রিমান্ডের বিরোধিতা করে। শুনানি শেষে আদালত চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
সিআইডির অনুসন্ধানে আরো উঠে এসেছে, হরিদাস ২০১৯ সালে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে তৌহিদ ইসলাম নাম ধারণ করেন এবং বিভিন্ন সময়ে নিজেকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে সরকারি চাকরি পাইয়ে দেওয়া, বদলি এবং বিভিন্ন আর্থিক লেনদেনের নামে প্রতারণা করেছেন-এমন অভিযোগও রয়েছে। বনানী থানায় তাঁর বিরুদ্ধে প্রতারণাসহ একাধিক ধারায় একটি মামলার তথ্যও তদন্তে পাওয়া গেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের নভেম্বরে রাজধানীর বনানী থেকে সহযোগীসহ তাঁকে আটক করা হয়েছিল। পরে আইনি প্রক্রিয়া শেষে তিনি মুক্তি পান।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ভারতে অবস্থানের পর ২০২৪ সালে এলাকায় ফিরে হরিদাস পলাশবাড়ীর রাধাগোবিন্দ ও কালীমন্দিরের আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেন। সেখানে ২৮ ফুট উচ্চতার শিবমূর্তি ও ৫৩ ফুট উচ্চতার কৃষ্ণমূর্তি নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ৮১ ফুট উচ্চতার রাম বিগ্রহ নির্মাণকাজ শুরু হলে সেটিকে এশিয়ার সর্ববৃহৎ রাম বিগ্রহ হিসেবে দাবি করা হয়। তবে অর্থায়নের উৎস নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় এবং স্থানীয়ভাবে আন্দোলন শুরু হলে গত ৯ জুন নির্মাণকাজ স্থগিত করে মন্দির কর্তৃপক্ষ।
এদিকে হরিদাসের আয়ের উৎস ও আর্থিক কর্মকাণ্ডের তদন্ত এবং তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে সাম্প্রতিক সময়ে গাইবান্ধায় সচেতন নাগরিকদের ব্যানারে একাধিক মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচিও অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সানা/ডিসি/আপ্র/১৩/৭/২০২৬