টানা বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও বন্যার মধ্যেই অনুষ্ঠিত হয়েছে ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ষষ্ঠ দিনের পরীক্ষা। সোমবার (১৩ জুলাই) দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কোমরসমান পানি পেরিয়ে, নৌকা ও ভ্যানে চড়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছাতে হয়েছে অনেক পরীক্ষার্থীকে। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পরীক্ষা নেওয়ায় শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় চলমান পরীক্ষা স্থগিতের দাবিও উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
বন্যা পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড এবং এর আওতাধীন মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা আগামী ১৬ জুলাই পর্যন্ত আগেই স্থগিত করা হয়। তবে অন্যান্য শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হয়েছে।
রোববারের রেকর্ড বৃষ্টিতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার রাস্তাঘাট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জলমগ্ন হয়ে পড়ে। কোথাও কোথাও পানি এখনও না সরায় নতুন করে বৃষ্টিতে দুর্ভোগ আরো বেড়েছে। এর মধ্যেই সোমবার সকাল থেকে পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বৃষ্টির পানি উপেক্ষা করে কেন্দ্রে ছুটতে দেখা যায়।
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে কুমিল্লার পরিস্থিতি। সেখানে কয়েকটি পরীক্ষাকেন্দ্রে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। বিশেষ করে কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রের সামনে ও আঙিনায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, পরীক্ষার্থীরা নৌকা, ভ্যান ও ময়লা পানি পেরিয়ে কেন্দ্রে প্রবেশ করছেন। এ ঘটনায় দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়।
নোয়াখালীর হাতিয়ার কয়েকটি পরীক্ষাকেন্দ্রেও পানি জমে যায়। উপজেলার শত শত পরিবার জলাবদ্ধতার মধ্যে পড়ায় পরীক্ষার্থীদের স্বাভাবিক প্রস্তুতি ব্যাহত হয়েছে বলে অভিযোগ করেন অনেকে।
শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগ, প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে পরীক্ষা গ্রহণের সিদ্ধান্তে অনেক পরীক্ষার্থী মানসিক চাপ ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়েছে। তাদের মতে, একটি পরীক্ষার সময়সূচির চেয়ে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, মানসিক স্বস্তি ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক পরীক্ষার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, টানা বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে স্বাভাবিক পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে যেসব এলাকার বাড়িঘরে পানি উঠেছে, তাদের জন্য পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
এদিকে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত করা হলেও এইচএসসি পরীক্ষা চালু থাকায় প্রশ্ন উঠেছে। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা ও ক্লাস স্থগিত করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সোমবারের সব পরীক্ষাও স্থগিত করা হয়েছে।
তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পরিস্থিতি বিবেচনা করেই পরীক্ষা গ্রহণ বা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ৬৪ জেলার জেলা প্রশাসক ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানদের সঙ্গে আলোচনা করে স্থানীয় পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। যেসব পরীক্ষা পিছিয়ে যাবে, সেগুলো পরবর্তী সময়ে নেওয়া হবে।
শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত সরকারের। বোর্ডগুলো সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির উত্তরাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, টানা বৃষ্টি ও বন্যার আশঙ্কায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ দুর্ভোগে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পরীক্ষার্থীদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
শিক্ষা গবেষক কে এম এনামুল হক বলেন, জুলাই-আগস্ট মাসে প্রতিবছরই দেশে বেশি বৃষ্টিপাত হয়। তাই আবহাওয়ার পূর্বাভাসের সঙ্গে সমন্বয় করে পাবলিক পরীক্ষার সূচি পুনর্বিন্যাসের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
তিনি বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ধরন পরিবর্তিত হচ্ছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের সঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সমন্বয় আরো শক্তিশালী হলে ভবিষ্যতে পরীক্ষার্থীদের ভোগান্তি কমানো সম্ভব হবে।
এদিকে কুমিল্লার ঘটনায় প্রশাসনের তৎপরতায় শেষ পর্যন্ত কেন্দ্র পরিবর্তন ও পরীক্ষার্থীদের অতিরিক্ত সময় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও সার্বিকভাবে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে পরীক্ষা গ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দাবি- ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে পরীক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও মানবিক বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
সানা/ডিসি/আপ্র/১৩/৭/২০২৬