২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ শুধু মাঠের লড়াইয়ে নয়, প্রযুক্তির ব্যবহারেও তৈরি করেছে নতুন ইতিহাস। ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি দলের অংশগ্রহণ, দীর্ঘতম টুর্নামেন্ট এবং তিন দেশ আয়োজিত এই বিশ্বকাপে দর্শকদের অভিজ্ঞতা আরো আধুনিক করতে এবং খেলাকে আরো নিখুঁত করতে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্মার্ট বল, উন্নত অফসাইড প্রযুক্তি, রোবট কুকুরসহ নানা অত্যাধুনিক ব্যবস্থা।
প্রযুক্তির এই নতুন অধ্যায়ে সবচেয়ে বড় আলোচনায় রয়েছে বিশ্বকাপের অফিসিয়াল বল ‘ট্রায়োন্ডা’। স্প্যানিশ ভাষায় যার অর্থ ‘তিন তরঙ্গ’। জার্মান ক্রীড়া সামগ্রী নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের তৈরি এই বলের ভেতরে যুক্ত করা হয়েছে ক্ষুদ্র ইনারশিয়াল মেজারমেন্ট ইউনিট বা আইএমইউ সেন্সর চিপ।
এই সেন্সর প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ বার বলের গতিবিধি বিশ্লেষণ করতে পারে। বলের গতি, ঘূর্ণন এবং ত্রিমাত্রিক অবস্থানের সূক্ষ্ম তথ্য সরাসরি সরবরাহ করে এটি। ফলে ভিডিও সহকারী রেফারি ব্যবস্থায় অফসাইডসহ জটিল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আরো নির্ভুলতা আসছে।
ফিফার গবেষণা ও মান নিয়ন্ত্রণ বিভাগের প্রধান নিকোলাস এভান্স বলেন, এই প্রযুক্তি রেফারিদের জানাতে পারবে-একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে বল ঠিক কী অবস্থায় রয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি খেলোয়াড়ের ত্রিমাত্রিক মডেল: ২০২৬ বিশ্বকাপে প্রযুক্তির ব্যবহার শুধু বলেই সীমাবদ্ধ নয়। খেলোয়াড়দের নিয়েও যুক্ত হয়েছে নতুন প্রযুক্তি। বিশ্বের অন্যতম প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে ফিফা চালু করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ত্রিমাত্রিক খেলোয়াড় মডেল।
এই প্রযুক্তিতে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া প্রতিটি খেলোয়াড়ের শরীর স্ক্যান করে তৈরি করা হচ্ছে নিখুঁত ডিজিটাল অবয়ব। মাত্র এক সেকেন্ডের মতো সময়েই সম্পন্ন হচ্ছে একটি স্ক্যান।
ফিফার মতে, এই প্রযুক্তি মাঠে দ্রুতগতির খেলা, খেলোয়াড়দের আড়ালে থাকা কিংবা কাছাকাছি অবস্থানের মধ্যেও তাদের অবস্থান নির্ভুলভাবে শনাক্ত করতে সহায়তা করবে। অফসাইডের সিদ্ধান্ত আরো সহজ ও দর্শকদের জন্য আরো বোধগম্য করে তুলতে সরাসরি সম্প্রচারেও ব্যবহার করা হচ্ছে এসব ত্রিমাত্রিক মডেল।
এ ছাড়া এবারের বিশ্বকাপে রেফারিদের শরীরে বিশেষ ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে দর্শকরা রেফারির দৃষ্টিকোণ থেকে মাঠের পরিস্থিতি দেখার নতুন অভিজ্ঞতা পাচ্ছেন।
নিরাপত্তায় মাঠে নামছে রোবট কুকুর: বিশ্বকাপ চলাকালে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও প্রযুক্তির ব্যবহার করছে আয়োজকরা। মেক্সিকোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে চার পায়ের রোবট কুকুর।
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় প্রবেশ, পরিস্থিতির ভিডিও ধারণ এবং তাৎক্ষণিক তথ্য নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে পাঠানোর জন্য তৈরি এসব রোবট। মানুষের জন্য বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে এগুলো প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের কাজ করবে।
মেক্সিকোর মন্তেরেই মহানগর এলাকার গুয়াদালুপে সিটি কাউন্সিল প্রায় ২৫ লাখ পেসো ব্যয়ে এসব রোবট সংগ্রহ করেছে। স্থানীয় মেয়র হেক্টর গার্সিয়া জানান, টুর্নামেন্ট চলাকালে সংঘর্ষ বা বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা তৈরি হলে পুলিশকে সহায়তায় এগুলো ব্যবহার করা হবে।
আরো উন্নত অফসাইড প্রযুক্তি: অফসাইডের সিদ্ধান্ত দ্রুত ও নির্ভুল করতে ফিফা এবারের বিশ্বকাপে উন্নত সংস্করণের আধা-স্বয়ংক্রিয় অফসাইড প্রযুক্তি চালু করেছে।
আগের প্রযুক্তিতে প্রায় ৫০ সেন্টিমিটারের বেশি অফসাইড হলে সতর্ক সংকেত দেওয়া হতো। নতুন ব্যবস্থায় প্রায় ১০ সেন্টিমিটার বা তার কাছাকাছি অবস্থানেও সংকেত পাওয়া যাচ্ছে।
এবার মাঠের রেফারিরা ভিডিও সহকারী রেফারি কক্ষের অপেক্ষা না করেই সরাসরি কানে থাকা যন্ত্রে তাৎক্ষণিক অডিও সতর্কতা পাচ্ছেন।
তবে প্রযুক্তিটির সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। এটি শুধু খেলোয়াড়ের অবস্থান বিশ্লেষণ করতে পারে; কোনো খেলোয়াড় খেলার ওপর প্রভাব ফেলেছেন কি না, কিংবা পরিস্থিতিগত সিদ্ধান্ত-এসব বিচার করতে পারে না।
প্রতিটি অর্ধে থাকছে পানি পানের বিরতি: খেলোয়াড়দের শারীরিক সক্ষমতা ও সুস্থতার কথা বিবেচনা করে ২০২৬ বিশ্বকাপে নতুন নিয়ম হিসেবে যোগ হয়েছে নির্ধারিত পানি পানের বিরতি।
প্রতিটি অর্ধের মাঝামাঝি সময়ে প্রায় তিন মিনিটের এই বিরতি দেওয়া হচ্ছে। আবহাওয়া, তাপমাত্রা বা স্টেডিয়ামের ধরন-কোনো কিছুর ওপর এটি নির্ভর করছে না।
২০২৬ বিশ্বকাপের আয়োজক কমিটির কর্মকর্তা মানোলো জুবিবিয়া বলেন, প্রতিটি ম্যাচেই এই বিরতি কার্যকর থাকবে। রেফারির বাঁশি বাজানোর পর নির্ধারিত তিন মিনিট শেষে আবার খেলা শুরু হবে।
তবে পানি পানের এই বিরতি নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে। অনেকের মতে, এতে খেলার স্বাভাবিক গতি কিছুটা ব্যাহত হতে পারে।
তারপরও ২০২৬ বিশ্বকাপ প্রমাণ করছে, আধুনিক ফুটবল এখন শুধু দক্ষতা ও কৌশলের খেলা নয়; প্রযুক্তিও হয়ে উঠছে মাঠের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। সূত্র: আল জাজিরা
সানা/ডিসি/আপ্র/১১/৭/২০২৬