দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে, ছুটির বিকেলে পার্কের নিরিবিলি পথে হাঁটছেন কেউ। অথচ সামনে চলছে বিশ্বকাপের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ। ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে যাচ্ছে, প্রতিপক্ষ আক্রমণ সাজাচ্ছে, সতীর্থরা ছুটছেন মাঠজুড়ে। কিন্তু লিওনেল মেসি? তিনি দাঁড়িয়ে আছেন, ধীরে হাঁটছেন, অপেক্ষা করছেন।
কিন্তু বল পায়ে আসার মুহূর্তেই বদলে যায় সবকিছু। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পাল্টে যায় মাঠের চিত্র, বদলে যায় ম্যাচের গতি। ৩৯ বছর বয়সেও মেসির এই ভিন্নধর্মী খেলার ধরন নিয়েই এখন ফুটবলবিশ্বে আলোচনা-কেন তিনি এত কম দৌড়ান, এত হাঁটেন, তবু কীভাবে ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হয়ে ওঠেন?
আধুনিক ফুটবল ক্রমেই হয়ে উঠছে আরো দ্রুতগতির ও শারীরিক শক্তিনির্ভর। সেখানে মেসি যেন এক ব্যতিক্রমী চরিত্র। তিনি পুরো ম্যাচজুড়ে ছুটে বেড়ান না; বরং অপেক্ষা করেন সেই বিশেষ মুহূর্তের জন্য, যখন তার এক ঝলক প্রতিভাই ম্যাচের ভাগ্য পাল্টে দিতে পারে।
ফিফার পরিসংখ্যান বলছে, এবারের বিশ্বকাপে পাঁচ ম্যাচে মেসি মোট ৩৫ হাজার ৮৬৮ মিটার দৌড়েছেন। এর মধ্যে ৬৪ শতাংশ, অর্থাৎ ২২ হাজার ৯৫৮ মিটার সময় তিনি কাটিয়েছেন সবচেয়ে কম গতির অঞ্চলে। যেখানে ঘণ্টায় গতি ছিল শূন্য থেকে সাত কিলোমিটারের মধ্যে। অর্থাৎ বেশির ভাগ সময় তিনি হেঁটেছেন কিংবা ধীরগতিতে চলেছেন।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফ কেপ ভার্দের বিপক্ষে শেষ ৩২-এর ম্যাচে মেসির দৌড়ের ধরন বিশ্লেষণ করতে একটি পরীক্ষা চালায়। দ্বিতীয়ার্ধের ১৫ মিনিটে দেখা যায়, মেসি মাত্র ৫১ সেকেন্ড দৌড়েছেন। পুরো ম্যাচের হিসাবে যা প্রায় পাঁচ মিনিটের কাছাকাছি। যদিও এটি পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক গবেষণা নয়, তবে এতে মেসির খেলার ধরন সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায়।
অদ্ভুত বিষয় হলো, এত কম দৌড়েও মেসিই গোলের দিক থেকে শীর্ষে। গ্রুপ পর্বে ৬১৮ জন মাঠের খেলোয়াড়ের মধ্যে কিলিয়ান এমবাপ্পের সঙ্গে যৌথভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন তিনি।
মেসির এই কৌশলের পেছনে রয়েছে অসাধারণ খেলা বোঝার ক্ষমতা এবং সতীর্থদের সহযোগিতা। আর্জেন্টিনার অন্য খেলোয়াড়রা জানেন, মেসিকে আক্রমণের শেষ মুহূর্তের জন্য শক্তি ধরে রাখতে হবে। তাই মাঠের বড় অংশের দায়িত্ব তারা নিজেদের কাঁধে তুলে নেন।
পরিসংখ্যানেও দেখা যায়, মেসির উচ্চগতির দৌড়ের সংখ্যা অন্য তারকা ফরোয়ার্ডদের তুলনায় অনেক কম। পাঁচ ম্যাচ শেষে মেসির উচ্চগতির দৌড় ছিল ২৯৮টি। যেখানে হ্যারি কেইনের ৬০০টি, ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের ৫১৪টি, উসমান দেম্বেলের ৪৭৭টি এবং মিকেল ওইয়ারসাবালের ৪৬১টি। কিলিয়ান এমবাপ্পেও করেছেন ৩৩৬টি উচ্চগতির দৌড়।
তবে ফুটবল শুধু দৌড়ের হিসাব দিয়ে বিচার করা যায় না। মেসি জানেন কখন অপেক্ষা করতে হবে, কখন গতি বাড়াতে হবে এবং কখন একটি মুহূর্তকে ইতিহাসে পরিণত করতে হবে।
মিসরের বিপক্ষে শেষ ষোলোর নাটকীয় ম্যাচে তার সেই অন্য রূপ দেখা যায়। আর্জেন্টিনা যখন ২-০ গোলে পিছিয়ে, তখন ম্যাচের শেষ ২০ মিনিটে মেসি যেন নিজের ভেতরের শক্তিকে জাগিয়ে তোলেন। ওই সময়ে তিনিই সবচেয়ে বেশি বল স্পর্শ করেন, শট নেন, ড্রিবল করেন এবং গোলের সুযোগ তৈরি করেন।
তবে প্রতিটি ম্যাচে এমন বিস্ফোরণ ঘটানো সম্ভব নয়। মেসির শক্তি হলো তার ধৈর্য, অপেক্ষা এবং সঠিক মুহূর্ত বেছে নেওয়ার ক্ষমতা।
তাই মাঠে তাকে হাঁটতে দেখা মানেই নিষ্ক্রিয়তা নয়। বরং সেই হাঁটার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে এক মহাতারকার হিসাব। তিনি জানেন-কখন স্থির থাকতে হয়, আর কখন এক মুহূর্তেই পুরো পৃথিবীকে চমকে দিতে হয়।
সানা/ডিসি/আপ্র/১১/৭/২০২৬