পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট প্রতিরোধ গড়ে না তুললে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, ওই সময় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের পাঁচটি ব্যাটালিয়ন আলাদাভাবে বিদ্রোহ করে জনগণকে সংগঠিত করেছিল।
মুক্তিযুদ্ধকে কোনো রাজনৈতিক দলের একক যুদ্ধ নয়, বরং ‘বাঙালির অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ’ হিসেবে উল্লেখ করে বীর বিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত এই মুক্তিযোদ্ধা বলেন, “ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট যদি ১৯৭১ সালে পাক বাহিনীর গণহত্যার প্রতিবাদে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু না করত, তাহলে এই দেশ এখনো পাকিস্তান থাকত।”
শনিবার (১১ জুলাই)) ঢাকার মহাখালীর রাওয়া কনভেনশন সেন্টারে ‘মুক্তিযুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ভূমিকা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
নিজের সেনাজীবন ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট তার কাছে অত্যন্ত প্রিয় একটি নাম। কমিশন পাওয়ার দিন থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই নাম হৃদয়ে ধারণ করবেন বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, “এখন আমার বয়স ৮২ বছর। মনে হয় নিজের ইচ্ছায় কিছুই করিনি। সৃষ্টিকর্তাই পরিচালিত করেছেন। ভাগ্যে যা লেখা আছে, সেভাবেই সময় যাচ্ছে।”
ফুটবল থেকে সেনাবাহিনীর পথে: স্পিকার জানান, সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা তার ছিল না। ফুটবল নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন তিনি। জগন্নাথ কলেজে প্রভাষক হিসেবে চাকরির সুযোগ পেয়েছিলেন এবং একই সময়ে সরকারি চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন।
তিনি বলেন, পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলের খেলোয়াড় থাকার সময় ফুটবল ফেডারেশনের তৎকালীন কর্মকর্তা মেজর মোহাম্মদ মালিক তাকে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার জন্য উৎসাহিত করেন।
প্রথমে সেনাবাহিনীর শিক্ষা কোরে কমিশন পেলেও পরে যুদ্ধরত কোনো শাখায় যোগ দেওয়ার আগ্রহ তৈরি হয় তার। প্রশিক্ষণের সময় প্লাটুন কমান্ডার তৎকালীন মেজর রাহাত আমানুল্লাহ ভাটি তাকে অন্য শাখায় যাওয়ার পরামর্শ দেন। এরপর তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দেওয়ার সুযোগ পান।
কাকুলে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে পরিচয়: পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি কাকুলে ফুটবল খেলার সময় তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের স্মৃতি তুলে ধরেন হাফিজ উদ্দিন।
তিনি বলেন, ফুটবল মাঠে জিয়াউর রহমান তার সঙ্গে আন্তরিকভাবে কথা বলেছিলেন এবং ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দেওয়ার বিষয়ে উৎসাহ দিয়েছিলেন। হাফিজ উদ্দিন বলেন, “আমি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি স্বাধীনতার মহান ঘোষক, এ দেশের মহান রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে, যিনি আমাকে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগদানে উৎসাহিত করেছিলেন।”
মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি জাতির যুদ্ধ: ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে স্পিকার বলেন, এটি কোনো রাজনৈতিক দলের যুদ্ধ ছিল না, এটি ছিল জনতার যুদ্ধ।
তিনি বলেন, “আমাদের মাত্র পাঁচটি ব্যাটালিয়ন ছিল, প্রায় চার হাজার সৈনিক ছিল। কিন্তু মুক্তিবাহিনীতে যুক্ত হয়েছিল প্রায় লাখো মানুষ। ছাত্র, শিক্ষক, রিকশাচালক, দোকানদার, বাসচালক, সহকারী থেকে শুরু করে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এই যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন।”
তার ভাষায়, মুক্তিযুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট নেতৃত্ব দিলেও ইতিহাসে তাদের অবদান যথেষ্টভাবে তুলে ধরা হয়নি।
তিনি বলেন, “রাজনীতিকরা সাধারণত অন্যের কৃতিত্ব দিতে চান না। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনতার যুদ্ধ, একটি জাতির যুদ্ধ।”
পাকিস্তানি বাহিনী বাঙালি জাতির সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে পরাজিত হয়েছিল মন্তব্য করে তিনি বলেন, “একটি সামরিক বাহিনী আরেকটি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারে। কিন্তু পাকিস্তানিরা একটি জাতির সঙ্গে যুদ্ধ করতে চেয়েছিল, আর সে কারণেই তারা পরাজিত হয়েছে।”
সিলেট দখলে ইস্ট বেঙ্গলের ভূমিকা: হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, একাত্তরে তৎকালীন ১৮টি জেলার মধ্যে সিলেট জেলা শহর মুক্তিবাহিনী একক প্রচেষ্টায় দখল করেছিল। তার দাবি, এ অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছিল ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রথম ব্যাটালিয়ন।
তিনি জানান, ১৫ ডিসেম্বর সিলেটের এমসি কলেজ এলাকায় সংঘটিত যুদ্ধে তিনি দুটি কোম্পানির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ওই যুদ্ধে তার কোম্পানির আটজন সদস্য শহীদ হন।
ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রতি নিজের আবেগের কথা তুলে ধরে স্পিকার বলেন, “কিসের স্পিকার, কিসের প্রধানমন্ত্রী, কিসের রাষ্ট্রপতি-ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মতো কিছু নেই। একজন সৈনিক হওয়ার মতো গৌরব আর কিছুতে নেই।”
অনুষ্ঠানের শেষে তিনি উপস্থিত সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, “ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট বাংলাদেশের স্বাধীনতায় গৌরবময় অবদান রেখেছে-যারা এটি স্বীকার করেন, তারা হ্যাঁ বলুন।” উপস্থিতদের সম্মতি পেয়ে তিনি বলেন, “হ্যাঁ জয়যুক্ত হয়েছে, হ্যাঁ জয়যুক্ত হয়েছে।”
সানা/ডিসি/আপ্র/১১/৭/২০২৬