তারেক মাহমুদ: লক্ষ্মীপুরে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে আত্মহত্যার ঘটনা। পারিবারিক কলহ, সম্পর্কের জটিলতা, অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক অস্থিরতা, মানসিক চাপসহ নানা কারণে জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ বেছে নিচ্ছেন জীবনের এই মর্মান্তিক পরিণতি। জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে লক্ষ্মীপুরে আত্মহত্যা করেছেন ৭২৫ জন। এর মধ্যে গত এক বছরেই আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ১৩৩টি।
জেলা পুলিশের তথ্যমতে, গত এক বছরে জেলার পাঁচ উপজেলায় নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন ১০৬ জন। বিষপানে আত্মহত্যা করেছেন ২৭ জন। এ ছাড়া অন্যান্য উপায়ে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ১৭টি। ২০২১ সালে যেখানে আত্মহত্যার সংখ্যা ছিল ৬০, সেখানে কয়েক বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে উদ্বেগজনক পর্যায়ে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আত্মহত্যার পেছনে একক কোনো কারণ কাজ করে না। পারিবারিক অশান্তি, যৌতুক, নির্যাতন, দাম্পত্য কলহ, প্রেম ও সম্পর্কের টানাপোড়েন, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যে গভীর সংকট তৈরি করছে। বিশেষ করে তরুণ-তরুণী ও মধ্যবয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে।
সচেতন নাগরিকরা মনে করছেন, বর্তমান সময়ে অনেক শিক্ষার্থী ও তরুণ ভার্চ্যুয়াল জগতের সঙ্গে অতিমাত্রায় যুক্ত হয়ে পড়ছে। বাস্তব জীবনের প্রত্যাশা ও স্বপ্ন পূরণে ব্যর্থতা, হতাশা এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণে অক্ষমতার কারণে কেউ কেউ চরম সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে আত্মহত্যার আগে অন্যের প্ররোচনা বা নির্যাতনের অভিযোগ উঠলেও বিচারিক দীর্ঘসূত্রিতার কারণে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সাংস্কৃতিক কর্মী মারজাহান চৌধুরী শিমু বলেন, সম্পর্কের জটিলতা ও প্রতারণার ঘটনায় অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। বিশেষ করে সামাজিক সম্মান হারানোর ভয় থেকে কেউ কেউ আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।
সমাজকর্মী মো. হানিফ বলেন, মাদকাসক্তি, সামাজিক অবক্ষয়, মোবাইলের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং নানা ধরনের মানসিক চাপ মানুষের জীবনবোধকে দুর্বল করে দিচ্ছে। এসব বিষয়ে পরিবার ও সমাজকে আরো দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে।
নাজিয়া আক্তার বলেন, অনেকেই জীবনের প্রতিকূল পরিস্থিতি সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেন না। সমস্যার সমাধানের পথ খোঁজার পরিবর্তে অতিরিক্ত চিন্তায় ডুবে গিয়ে হতাশ হয়ে পড়েন, যা অনেক সময় আত্মহত্যার মতো ভয়াবহ সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়।
স্কুল শিক্ষক আতিকুল ইসলাম বলেন, আত্মহত্যা এখন একটি সামাজিক সংকটে পরিণত হয়েছে। এটি প্রতিরোধে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
লক্ষ্মীপুর টিআইবির সনাক সদস্য মো. হাবিবুর রহমান সবুজ বলেন, নৈতিক অবক্ষয়, মোবাইলের অপব্যবহার, প্রেমঘটিত সমস্যা ও জীবনের প্রতি অনীহার মতো বিষয়গুলো আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়াচ্ছে। শিক্ষাব্যবস্থায় মানসিক স্বাস্থ্য, নৈতিক শিক্ষা ও সচেতনতা কার্যক্রম যুক্ত করা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।
লক্ষ্মীপুর জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা সুলতানা জোবায়দা খানম বলেন, জীবনের কোনো সমস্যাই আত্মহত্যার মাধ্যমে সমাধান হয় না। হতাশার সময়ে পরিবার ও কাছের মানুষের সহযোগিতা নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের আবেগ ও মানসিক পরিবর্তনের দিকে অভিভাবকদের বাড়তি নজর দিতে হবে।
লক্ষ্মীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হোসাইন মোহাম্মদ রায়হান কাজেমী বলেন, গত এক বছরে জেলায় ফাঁস দিয়ে ১০৬ জন, বিষপানে ২৭ জনসহ মোট ১৩৩ জন আত্মহত্যা করেছেন। পাঁচ বছরে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭২৫ জনে। তিনি বলেন, প্রবাসী পরিবারের একাকিত্ব, হীনম্মন্যতা, সম্পর্কের জটিলতা ও পারিবারিক সমস্যার কারণে অনেক আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে।
তিনি আরো বলেন, আত্মহত্যা প্রতিরোধে পুলিশ স্কুল-কলেজে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। পাশাপাশি কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার প্রসার এবং কিশোর-কিশোরী ও মধ্যবয়সীদের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আত্মহত্যা শুধু একটি প্রাণহানি নয়, এটি একটি পরিবার ও সমাজের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। তাই সামাজিক বন্ধন শক্তিশালী করা, মানসিক সংকটে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং দ্রুত পরামর্শসেবা নিশ্চিত করার মাধ্যমে এই প্রবণতা কমানো সম্ভব।
সানা/ডিসি/আপ্র/১৫/৭/২০২৬