বিরোধী দলের সদস্যদের আপত্তি ও যাচাই-বাছাইয়ের দাবি উপেক্ষা করেই জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা এবং শিল্প স্থাপন ও অবকাঠামো উন্নয়ন দ্রুত করার লক্ষ্যে প্রণীত ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ বিল, ২০২৬’।
বুধবার (১৫ জুলাই) সংসদের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে বিলটি উত্থাপন ও পাসের প্রস্তাব করেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। পরে কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়।
সংসদে বিল উত্থাপনের অনুমতি চাওয়া থেকে শুরু করে পাস হওয়া পর্যন্ত সময় লাগে প্রায় ২৮ মিনিট।
বিলের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কর্তৃপক্ষ বিলুপ্ত করে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ’ গঠনের বিধান রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল আইন ২০১০, বাংলাদেশ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব আইন ২০১৫, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন ২০১৬ এবং ওয়ান স্টপ সার্ভিস আইন ২০১৮ রহিত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিলটি উত্থাপনের পর থেকেই বিরোধী দলের সদস্যরা এটি সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো, বিস্তারিত যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সময় দেওয়া এবং বিভিন্ন ধারায় সংশোধনী আনার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানান।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, এটি নতুন কোনো আইনি ধারণার ভিত্তিতে তৈরি করা হয়নি। বিনিয়োগকারীদের সেবা সহজ ও দ্রুত করতে একই ধরনের কাজ করা তিনটি কর্তৃপক্ষকে একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন ব্যবস্থায় বিনিয়োগ ও ব্যবসা সংক্রান্ত সব ধরনের সেবা, অনুমোদন, লাইসেন্স, ছাড়পত্র ও পারমিট দিতে একটি একক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করা হবে।
প্রস্তাবিত ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের’ গভর্নিং বোর্ডের সভাপতি হবেন প্রধানমন্ত্রী বা তাঁর মনোনীত ব্যক্তি। একজন চেয়ারম্যান ও সাতজন সার্বক্ষণিক সদস্য কর্তৃপক্ষের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।
বিলটি স্বল্প সময়ের নোটিশে উত্থাপনের অনুমতি চাওয়া হলে আপত্তি জানান পাবনা-১ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান।
তিনি বলেন, ৯ জুলাই মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পরও সংসদ সদস্যদের নির্ধারিত সময়ে বিলের কপি দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে বাতিল হতে যাওয়া চারটি আইনের সঙ্গে নতুন বিলের পার্থক্য তুলে ধরে কোনো তুলনামূলক বিবরণও দেওয়া হয়নি।
নাজিবুর রহমান বলেন, ৬৭ ধারার একটি বিল একই দিনে উত্থাপন ও পাসের উদ্যোগ নেওয়ায় সংসদ সদস্যদের পক্ষে তা পড়ে দেখা, সংশোধনী প্রস্তুত করা কিংবা জনমত যাচাইয়ের দাবি তোলা সম্ভব নয়।
তিনি বিলটি সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানোর দাবি জানিয়ে বলেন, আইন যাচাই-বাছাই করা সংসদ সদস্যদের অধিকার ও দায়িত্বের অংশ। তাই তাড়াহুড়া করে বিল পাস করা উচিত নয়।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, প্রতিটি বিল স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো বাধ্যতামূলক নয়। কার্যপ্রণালি বিধিতে এ বিষয়ে বাধ্যবাধকতা নেই।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কর্তৃপক্ষের কাজের মধ্যে পুনরাবৃত্তি থাকায় বিনিয়োগকারীরা সেবা পেতে সময়ক্ষেপণ ও জটিলতার মুখে পড়ছিলেন। এ সমস্যা দূর করতেই তিনটি প্রতিষ্ঠানকে একীভূত করা হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, এটি কোনো সংশোধনী বিল নয়; বরং কয়েকটি আইন ও প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম একত্র করে নতুন কাঠামো তৈরির উদ্যোগ। তাই আলাদা তুলনামূলক বিবরণ দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি সরকার।
বিলের কয়েকটি ধারায় সংশোধনী দেওয়ার সুযোগ চেয়ে বক্তব্য দেন কুমিল্লা-৪ আসনের এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ।
তিনি বলেন, বিলের ২১, ২৫, ২৮, ৩৩ ও ৩৫ ধারাসহ কয়েকটি ধারায় তাঁদের সংশোধনী রয়েছে। লিখিতভাবে সংশোধনী জমা দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার জন্য তিনি স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, বিলটি অবিলম্বে বিবেচনার জন্য কার্যপ্রণালি বিধির সংশ্লিষ্ট শর্ত স্থগিত করা হয়েছে। ফলে লিখিত সংশোধনী গ্রহণ, তা সদস্যদের মধ্যে বিতরণ এবং পরে উত্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সময় নেই।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংশোধনী দেওয়া সংসদ সদস্যদের গণতান্ত্রিক অধিকার। তবে সময় স্বল্পতার কারণে লিখিত সংশোধনীর আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষ করা সম্ভব হয়নি। যৌক্তিক কোনো সংশোধনী প্রয়োজন হলে ভবিষ্যতে তা বিবেচনা করা হবে।
বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বিলটি যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ না দেওয়ার সমালোচনা করেন।
তিনি বলেন, আইন প্রণয়ন শুধু সংসদ সদস্যদের অধিকার নয়, দায়িত্বও। কোনো বিল না পড়ে বা পর্যাপ্ত যাচাই না করে শুধু সরকারের ওপর আস্থা রেখে পাস করলে আইন প্রণেতাদের দায়িত্ব পালনে ঘাটতি থাকতে পারে।
তিনি একই দিনে বিল উত্থাপন ও পাসের উদ্যোগকে সংসদের জন্য খারাপ নজির হিসেবে উল্লেখ করেন।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন। তবে এই বিল সম্পূর্ণ নতুন কোনো আইনি কাঠামো নয়; একই উদ্দেশ্যে কাজ করা কয়েকটি আইন ও কর্তৃপক্ষের কার্যক্রমকে একটি কাঠামোর মধ্যে আনা হয়েছে।
তিনি বলেন, অনেক দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী চুক্তির অপেক্ষায় রয়েছেন। কয়েক মাস ধরে বিনিয়োগ কার্যক্রম পিছিয়ে যাচ্ছে। দ্রুত আইনটি কার্যকর হলে বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
সানা/আপ্র/১৫/৭/২০২৬