টানা ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসের পর চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে বন্যার পানি কমতে শুরু করেছে। অনেক মানুষ আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে ফিরছেন নিজ ঘরে। তবে পানি নেমে গেলেও কাটেনি তাদের দুর্ভোগ। বরং এখন সামনে এসেছে নতুন সংকট-ভাঙা ঘর মেরামত, নষ্ট হওয়া ফসল ও জীবিকা পুনরুদ্ধার এবং স্বাভাবিক জীবনে ফেরার কঠিন লড়াই।
কোথাও বসতঘর ধসে পড়েছে, কোথাও ঘরের ভেতর জমেছে কাদা। নষ্ট হয়েছে কৃষিজমি, মাছের ঘের, সড়ক ও বিভিন্ন অবকাঠামো। অনেক এলাকায় এখনো দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার, শিশুখাদ্য ও প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকট।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলমান বন্যায় দেশের ৫৯টি উপজেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ পর্যন্ত মারা গেছেন ৫৭ জন। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৬ লাখ ৯ হাজার ৪১১ জন। পানিবন্দি হয়েছে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩১১ পরিবার। পানির উচ্চতা কমলেও এসব মানুষের সামনে এখন ঘরবাড়ি, কৃষি ও জীবিকা ফিরিয়ে আনার বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রাথমিক হিসাবে বন্যায় ১৪ হাজার ৩০০ হেক্টর কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ধান, সবজি ও পানের বরজ। মৎস্য খাতেও বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। প্রায় ৩৯ কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
চট্টগ্রামে ক্ষতির পরিমাণ ৩০০ কোটি টাকা ছাড়ানোর আশঙ্কা: চট্টগ্রামে বন্যার পানি কমে গেলেও ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র এখন স্পষ্ট হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাবে ঘরবাড়ি, সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় জেলার ১৫ হাজার ২২৩টি বসতঘর, ৩৮২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রায় ১ হাজার ৩২০ কিলোমিটার সড়ক এবং ১৬০টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুধু এসব অবকাঠামো খাতেই প্রাথমিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৮০ কোটি টাকা।
প্রাণিসম্পদ খাতেও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। মারা গেছে ৩৫টি গরু, ৮৭টি ছাগল, ৪০টি ভেড়া, ১ লাখ ৩৯৫টি মুরগি ও ১ হাজার হাঁস। এ খাতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৮ কোটি ১৭ লাখ টাকা।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, ১৫টি উপজেলার ১৫৩টি ইউনিয়নে ৯ হাজার ৯৩৩টি পুকুর ও দিঘি, ৩২০টি চিংড়ির ঘের এবং প্রায় ৪ হাজার ১১২ হেক্টর জলাশয়ের মাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মৎস্য খাতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৯২ কোটি টাকা।
এদিকে কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ১৭ হাজার হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে কৃষি খাতের পূর্ণাঙ্গ ক্ষতির হিসাব এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
চট্টগ্রামে বন্যা ও বৃষ্টিজনিত বিভিন্ন ঘটনায় শিশুসহ ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা জানান, জেলার ১৭৬টি ইউনিয়নের প্রায় ৭ লাখ ৫৯ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছিলেন। বর্তমানে অধিকাংশ এলাকায় পানি নেমে গেলেও দুর্ভোগ রয়ে গেছে।
ঘরে ফিরেও থাকার জায়গা নেই: চট্টগ্রামের বাঁশখালীর কাথারিয়া ইউনিয়নের ৭৫ বছর বয়সী নওশা মিয়া বলেন, পানি কমেছে ঠিকই, কিন্তু ঘরে ফিরলেই থাকা যাচ্ছে না। ঘরের কাদা পরিষ্কার করতে হবে, দেয়াল ও চাল মেরামত করতে হবে। এরপর কীভাবে সংসার শুরু করবেন, সেটিই এখন বড় চিন্তা।
বাঁশখালীর প্রেমাশিয়া এলাকার নুরুল আমিন বলেন, ছোট ছেলেমেয়েরা কয়েক দিন ধরে দুর্ভোগে আছে। পানি নেমেছে, কিন্তু ঘরে রান্না করার মতো অবস্থাও তৈরি হয়নি।
পশ্চিম কোকদণ্ডী গ্রামের আশা খাতুনের ঘর বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। ঘর, ধানের গোলা, চাল-ডাল ও গৃহপালিত প্রাণী-কিছুই রক্ষা করতে পারেননি তিনি। এখন প্রতিবেশীর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, সারা জীবনের সঞ্চয়ে তৈরি ঘরটি হারিয়েছেন। এখন কোথায় যাবেন, কীভাবে আবার জীবন শুরু করবেন-তা বুঝতে পারছেন না।
কক্সবাজার, পার্বত্য এলাকাতেও ক্ষতির চিত্র ভয়াবহ: কক্সবাজারে পানি নামতে শুরু করলেও ক্ষতির চিহ্ন স্পষ্ট। জেলার ৭০টি ইউনিয়ন ও চারটি পৌরসভায় ১ হাজার ৬৬৩টি বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ১ হাজার ৬২৪ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক, ২০১ কিলোমিটার পাকা সড়ক, ২২০ কিলোমিটার ইটের সড়ক, ৩০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ৪৩ হাজার ২১০ হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বান্দরবানে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও অবকাঠামোর চিত্র সামনে এসেছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের হিসাবে অন্তত ২১ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলায় প্রায় ১২ হাজার ৫০০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যা ও পাহাড়ধসে মারা গেছে সাতজন।
রাঙ্গামাটিতে এখনো ৪২টি আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন ৩ হাজার ৭৩৯ জন। পানিবন্দি রয়েছে ১ হাজার ৬৪৬টি পরিবার। অতিবৃষ্টিতে সাত উপজেলায় ১৩৫টি পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। কয়েকটি এলাকায় সড়ক যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
পুনর্বাসনেই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মানবিক সহায়তা হিসেবে দেশের ৬৪ জেলার প্রশাসকদের মধ্যে ৮ হাজার ৯৫০ টন চাল ও ৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বন্যাকবলিত সাত জেলার জন্য আলাদাভাবে ৩ হাজার ২৫০ টন চাল ও ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন শুধু ত্রাণ নয়, দ্রুত পুনর্বাসন কার্যক্রমই সবচেয়ে জরুরি। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ঘরবাড়ি পুনর্র্নিমাণ, কৃষি পুনরুদ্ধার এবং জীবিকার ব্যবস্থা করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
পানি নেমে গেলেও বন্যাদুর্গত মানুষের জীবনে যে ক্ষত তৈরি হয়েছে, তা পূরণ করতে সময় লাগবে। এখন তাদের প্রয়োজন সহায়তার হাত এবং নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ।
সানা/আপ্র/১৫/৭/২০২৬