আজ ১৬ জুলাই ‘জুলাই শহীদ দিবস’। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় ২০২৪ সালের এই দিনে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে নিহত হন। একই দিনে চট্টগ্রামে মোহাম্মদ ওয়াসিম আকরামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও কয়েকজন আন্দোলনকারী প্রাণ হারান। তাঁদের আত্মত্যাগ পরবর্তী সময়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে গণঅভ্যুত্থানে রূপ দেয় এবং দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
সেই আত্মত্যাগের স্মরণে জাতীয়ভাবে আজ ‘জুলাই শহীদ দিবস’ পালিত হচ্ছে। গত বছরের ২ জুলাই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জারি করা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রতিবছর ১৬ জুলাইকে ‘জুলাই শহীদ দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবস পালনের তালিকায় দিনটিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণী দিয়েছেন। তাঁরা জুলাই শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁদের আত্মত্যাগের আদর্শ ধারণ করে একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, মানবিক ও জবাবদিহিমূলক বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন।
রাষ্ট্রপতি তাঁর বাণীতে বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘদিনের বৈষম্য, দুর্নীতি, গুম-খুন, ভোটাধিকার হরণ, নিপীড়ন ও ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে জনগণের সম্মিলিত প্রতিরোধ। তিনি বলেন, ১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাঈদের আত্মত্যাগ এবং একই দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে তরুণদের প্রাণদান আন্দোলনকে নতুন মোড়ে নিয়ে যায়।
রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, এই গণঅভ্যুত্থান কোনো ব্যক্তি বা দলের একক অর্জন নয়; এটি গণতন্ত্রকামী মানুষের সম্মিলিত সাহস, আত্মত্যাগ ও আকাঙ্ক্ষার ফসল। শহীদদের আত্মদান স্মরণ করিয়ে দেয়—রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং জনগণের অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব। শহীদ ও আহতদের যথাযথ সম্মান, পুনর্বাসন এবং সংশ্লিষ্ট হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করতে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বাণীতে ১৬ জুলাইকে জাতীয় ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় সন্ধিক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এদিন নিরস্ত্র ছাত্র-জনতা রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে যে সাহসী প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, তা জাতির বিবেককে জাগ্রত করেছিল। বিশেষ করে দুই হাত প্রসারিত করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা শহীদ আবু সাঈদের দৃশ্য গণতান্ত্রিক অধিকারবঞ্চিত জাতির ভয় জয় করার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদ, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, লুণ্ঠন, গুম, খুন, দমন-পীড়ন ও ভোটাধিকার হরণের বিরুদ্ধে সমগ্র জাতির ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ। শহীদদের আত্মত্যাগের শক্তিতেই দেশের মানুষ নতুনভাবে গণতন্ত্র, অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সুযোগ পেয়েছে।
তিনি আরও বলেন, শহীদদের রক্ত কখনো বৃথা যেতে পারে না। তাঁদের আত্মত্যাগের পথ ধরেই নিরাপদ, মানবিক, স্বনির্ভর ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হবে শহীদদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা।
দিবসটি উপলক্ষে দেশজুড়ে নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন জানিয়েছেন, রংপুরে শহীদ আবু সাঈদের স্মরণে একটি স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হবে। অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খান উপস্থিত থাকবেন। একই দিনে কক্সবাজারের পেকুয়ায় শহীদ মোহাম্মদ ওয়াসিম আকরামের স্মরণেও আরেকটি স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হবে।
এ ছাড়া দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জুলাই শহীদদের স্মরণে আলোচনা সভার আয়োজন করা হবে। বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী, বোর্ডের অধীন সব মাদ্রাসায় সুবিধাজনক সময়ে স্মরণসভা ও বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হবে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জুলাই শহীদদের আত্মত্যাগ কেবল ইতিহাসের অংশ নয়, ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ বিনির্মাণেরও প্রেরণা। তাঁদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, মানবিক মূল্যবোধ ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেই পালিত হচ্ছে এবারের জুলাই শহীদ দিবস।
সানা/আপ্র/১৬/৭/২০২৬