সরকার কোনোভাবেই চরমপন্থা বা উগ্রবাদকে প্রশ্রয় দেবে না বলে দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, এ বিষয়ে সরকার বিরোধী দলের পূর্ণ সহযোগিতা পাবে বলে তাঁর বিশ্বাস। একই সঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেন, দেশে আর কখনো ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না এবং বাংলাদেশ যেন কোনোভাবেই তাঁবেদারি রাষ্ট্রে পরিণত না হয়—সে লক্ষ্যে জাতীয় ঐক্য অটুট থাকবে।
বুধবার (১৫ জুলাই) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের (বাজেট অধিবেশন) সমাপনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। গত ৭ জুন শুরু হওয়া এ অধিবেশন বুধবার শেষ হয়।
এ অধিবেশনে মোট ২৬টি কার্যদিবস ছিল। ৩০ জুন বাজেট পাস হয়। অধিবেশনে ১০টি বিল পাস হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উত্তরদানের জন্য ২৭৮টি প্রশ্ন জমা পড়ে, যার মধ্যে ৩৫টির উত্তর টেবিলে উপস্থাপন করা হয়। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের উদ্দেশে ৫ হাজার ৩১টি প্রশ্ন জমা পড়ে এবং ৩ হাজার ৪৭৪টির উত্তর দেওয়া হয়। সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটিসহ মোট ১১টি সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে।
উগ্রবাদ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান
সমাপনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার কোনোভাবেই চরমপন্থা বা উগ্রবাদকে প্রশ্রয় দেবে না। সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও উগ্রবাদ ও চরমপন্থা প্রতিরোধের প্রশ্নে সবাই একসঙ্গে কাজ করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে চরমপন্থা ও উগ্রবাদের কোনো স্থান থাকবে না এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে কারও গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করা হবে না।
ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পারিবারিক মূল্যবোধ পুনরুদ্ধার এখন অত্যন্ত জরুরি। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি পরিবারের দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।
সংসদ নেতা বলেন, সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলের সঙ্গে মতভিন্নতা থাকবেই, তবে শত্রুতা নয়। প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের পরিবর্তে ন্যায়পরায়ণতাই হবে রাজনীতির ভিত্তি।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে আর কখনো ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না এবং দেশ কোনোভাবেই তাঁবেদারি রাষ্ট্রে পরিণত হবে না—এই প্রশ্নে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে জাতীয় ঐক্য রয়েছে। যেকোনো মূল্যে সেই ঐক্য অটুট রাখা হবে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার
বিএনপির ৩১ দফা এখন দেশের মানুষের ৩১ দফায় পরিণত হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় সব রাজনৈতিক দল জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে। জুলাই সনদের প্রতিটি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে তারা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ।
ঋণনির্ভর নয়, বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদের সময়ে উন্নয়নের গল্প শোনা গেলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। তিনি অভিযোগ করেন, বিদ্যুৎ খাতকে ব্যবহার করে স্বৈরাচার ও তাদের ঘনিষ্ঠরা নিজেদের স্বার্থ হাসিল করেছে।
তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতি এখনও দুর্বল, বিশ্বও যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তবু সরকার অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথে এগোচ্ছে এবং জনগণকে সঙ্গে নিয়েই উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে।
বাজেট বাস্তবায়নে সবার সহযোগিতা কামনা করে তিনি বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতিবন্ধকতা দূর, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, ন্যায়ভিত্তিক সুযোগ সৃষ্টি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে শহীদদের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনীতি শক্তিশালী করার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে চায়। এই পরিকল্পনা সফল হলে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান
দুর্নীতি দমন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার বলে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বৈরাচারী শাসনামলে প্রতিবছর প্রায় ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। দুর্নীতিই দেশের অধিকাংশ সমস্যার মূল কারণ। তাই যেকোনো উপায়ে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার বদ্ধপরিকর।
তিনি আরও জানান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে একটি পেশাদার বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কল্যাণরাষ্ট্রের পরিকল্পনা
প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেন, একটি বিশেষ দেশকে সুবিধা দিতে আগের সরকারের সময়ে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতকে ধ্বংস করা হয়েছিল। বর্তমান সরকারের লক্ষ্য জনগণকে কেন্দ্র করে একটি কল্যাণরাষ্ট্র গড়ে তোলা, যেখানে প্রতিটি নাগরিক ন্যূনতম রাষ্ট্রীয় সেবা পাবেন।
তিনি জানান, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ বিভিন্ন সেবাকে ভবিষ্যতে একটি ‘ইউনিভার্সেল কার্ড’-এর আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব সুবিধা জনগণের প্রতি রাষ্ট্রের করুণা নয়, বরং রাষ্ট্রের দায়িত্ব বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
শিক্ষা খাত নিয়েও আগের সরকারের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নকলকে উৎসাহ এবং অটো প্রমোশনের মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছিল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে শিক্ষা খাতে মোট দেশজ উৎপাদনের ৫ শতাংশ বরাদ্দে পৌঁছানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
জনগণের সংসদ গড়ে তোলার অঙ্গীকার
সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সংসদ জনগণের প্রত্যাশার সংসদে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন বিষয়ে মতভিন্নতা থাকলেও প্রাণবন্ত আলোচনা হয়েছে, যা গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। জনগণের জীবন, সম্পদ ও নিরাপত্তা রক্ষা সরকারের পবিত্র দায়িত্ব। সরকার এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চায়, যেখানে রাষ্ট্র ও সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক হবে, অর্থনীতি হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং প্রতিটি নাগরিকের জীবন হবে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও সম্ভাবনাময়।
সানা/আপ্র/১৬/৭/২০২৬