জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নেতা জোবায়েদ হোসেন হত্যা মামলার তদন্তে ‘ত্রিভুজ প্রেমের দ্বন্দ্বের’ বিষয়টি উঠে এসেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। প্রায় নয় মাস তদন্ত শেষে আদালতে দেওয়া অভিযোগপত্রে হত্যাকাণ্ডের পেছনে ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েনকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা।
গত ৩০ জুন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বংশাল থানার উপপরিদর্শক মো. আশরাফ হোসেন ঢাকার আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। এতে জোবায়েদের ছাত্রী বার্জিস শাবনাম বর্ষা, বর্ষার পরিচিত মো. মাহির রহমান এবং মাহিরের বন্ধু ফারদীন আহম্মেদ আয়লানকে আসামি করা হয়েছে।
বুধবার (১৫ জুলাই) অভিযোগপত্রটি ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট নাজমিন আক্তারের আদালতে উপস্থাপন করা হয়। আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণের বিষয়ে আগামী ১২ আগস্ট দিন ধার্য করেছেন।
তদন্ত কর্মকর্তা মো. আশরাফ হোসেন বলেন, অভিযোগপত্রে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর দাবি, তিনজনের সম্পর্কজনিত দ্বন্দ্বের জেরেই জোবায়েদকে হত্যা করা হয়েছে।
আরমানিটোলায় হত্যাকাণ্ড
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জোবায়েদ হোসেন গত বছরের ১৯ অক্টোবর পুরান ঢাকার আরমানিটোলায় হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। তিনি পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করতেন। ঘটনার দিন বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে বংশাল থানাধীন নুর বক্স লেনের রৌশান ভিলায় বর্ষাকে পড়াতে যান তিনি।
মামলার নথি অনুযায়ী, ওই দিন বিকেল ৪টা ৩০ মিনিটের দিকে ভবনের নিচতলায় জোবায়েদের ওপর ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে ভবনের তৃতীয় তলার সিঁড়িতে পড়ে থাকতে দেখা যায়।
ঘটনার দুই দিন পর জোবায়েদের বড় ভাই এনায়েত হোসেন সৈকত বাদী হয়ে বংশাল থানায় হত্যা মামলা করেন।
সম্পর্কের টানাপোড়েনের তথ্য তদন্তে
অভিযোগপত্রে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, বর্ষা ও মাহিরের মধ্যে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিল। মাহির বোরহানউদ্দিন কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং বর্ষা ঢাকা মহানগর মহিলা কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকায় পাশাপাশি এলাকায় বেড়ে ওঠা বর্ষা ও মাহিরের মধ্যে ছোটবেলা থেকেই ঘনিষ্ঠতা ছিল। একপর্যায়ে তাদের সম্পর্কের অবনতি হয়। পরে গৃহশিক্ষক হিসেবে জোবায়েদের সঙ্গে বর্ষার পরিচয় ও সম্পর্ক তৈরি হয়।
তদন্ত কর্মকর্তা জানান, জোবায়েদ ও বর্ষার সম্পর্কের বিষয়ে মোবাইল ফোনের ফরেনসিক বিশ্লেষণসহ বিভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, পরে মাহির ও বর্ষার সম্পর্ক আবারও স্বাভাবিক হয়। তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, তখন জোবায়েদের সঙ্গে বর্ষার সম্পর্ক এবং ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি বা ভিডিও প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে তাঁকে হুমকি হিসেবে দেখতে শুরু করেন বর্ষা ও মাহির। এরপর তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিকল্পনা ও হামলার অভিযোগ
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হত্যাকাণ্ডের আট থেকে নয় দিন আগে মাহির ও আয়লান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরে তাঁরা দুটি ছুরি কেনেন এবং সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তার দাবি, বর্ষা নিয়মিত জোবায়েদের টিউশনে আসা-যাওয়ার তথ্য মাহিরকে জানাতেন। ঘটনার দিন বিকেল ৪টা ২৭ মিনিটে জোবায়েদ বর্ষাকে তাঁর অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য পাঠান। সেই তথ্যের ভিত্তিতে মাহির ও আয়লান হামলা চালান বলে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, জোবায়েদের ঘাড়ের রগে ধারালো অস্ত্রের আঘাত করা হয় এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তাঁর মৃত্যু হয়।
বাদীপক্ষের বক্তব্য
মামলার বাদী এনায়েত হোসেন বলেন, পুলিশ তিনজনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে বলে তিনি জানতে পেরেছেন। তবে তিনি নিজে এখনো অভিযোগপত্রটি পড়েননি।
তিনি বলেন, এটি একটি চাঞ্চল্যকর মামলা। বিচারিক প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু ও শেষ হলে মানুষ ইতিবাচক বার্তা পাবে।
বাদীপক্ষের আইনজীবী ইশতিয়াক হোসেন জিপু বলেন, এটি প্রেমের সম্পর্কের দ্বন্দ্ব থেকে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড। তিনি অভিযোগ করেন, বর্ষা হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনায় ভূমিকা রেখেছেন এবং মাহির ও আয়লান তা বাস্তবায়ন করেছেন। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলার বিচার দাবি করেন তিনি।
আসামিপক্ষের বক্তব্য
বর্ষার মা আনিকা রহমান দাবি করেছেন, তাঁর মেয়ে নির্দোষ।
বর্ষার আইনজীবী নুর মাহবুবুল আলম অভিযোগপত্রের বিষয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, তদন্তে পাওয়া তথ্য আদালতে প্রমাণ করতে হবে। তিনি দাবি করেন, মামলায় প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী নেই এবং আসামিদের কাছ থেকে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেওয়ার বিষয়েও তাঁদের আপত্তি রয়েছে।
তিনি বলেন, আসামিরা আদালতে আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে ন্যায়বিচার পাওয়ার চেষ্টা করবেন।
মামলার আসামি বর্ষা, মাহির রহমান ও ফারদীন আহম্মেদ আয়লান ২১ অক্টোবর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে। বর্তমানে তাঁরা কারাগারে রয়েছেন।
সানা/আপ্র/১৬/৭/২০২৬