ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে উত্তরের পথে শুরু হয়েছে ঘরমুখো মানুষের চাপ। গাজীপুরে ৪০ শতাংশ শিল্পকারখানায় ছুটি ঘোষণা করায় চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকায় মানুষের ঢল নামে। এতে ঢাকা-টাঙ্গাইল ও চন্দ্রা-নবীনগর মহাসড়কে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে পড়ে।
সোমবার (২৫ মে) বিকেল ৪টায় সরেজমিনে দেখা যায়, চন্দ্রা ত্রিমোড়কে কেন্দ্র করে ঢাকা–টাঙ্গাইল মহাসড়কের সফিপুর থেকে চন্দ্রা উড়াল সড়ক এবং চন্দ্রা–নবীনগর সড়কের কবিরপুর থেকে চন্দ্রা ত্রিমোড় পর্যন্ত উত্তরবঙ্গগামী লেনে দীর্ঘ যানজট রয়েছে।
যানজট নিরসনে হাইওয়ে ও ট্রাফিক পুলিশের শতাধিক সদস্য দায়িত্ব পালন করলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। বরং যানজটের তীব্রতা ধীরে ধীরে বাড়ছে বলে স্থানীয়রা জানান।
বাসচালক আমজাদ সরদার বলেন, চন্দ্রা এলাকায় যানবাহনের চাপ ও অনিয়মের কারণে দীর্ঘ সময় ধরে গাড়ি আটকে থাকতে হচ্ছে। এতে পুরো সড়কে চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
আরেক চালক রফিকুল মিয়া জানান, মানুষের চাপ বাড়তে শুরু করেছে। সন্ধ্যার পর যানজট আরো তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যাত্রী তোফাজ্জল হোসেন বলেন, এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। যানজটের কারণে নির্ধারিত গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না, ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে।
এদিকে থেমে থেমে বৃষ্টি চলায় ঈদযাত্রা আরো দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ যাত্রীদের। অন্যদিকে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে বৈরী আবহাওয়ার কারণে যাত্রীর চাপ তুলনামূলক কম দেখা গেছে। তবে সন্ধ্যার পর চাপ বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন লঞ্চ কর্তৃপক্ষ।
সোমবার সকালে সদরঘাটে গিয়ে দেখা যায়, যাত্রীদের উপস্থিতি কম থাকলেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার রয়েছে। বিভিন্ন ঘাটে সারিবদ্ধভাবে যাত্রী ওঠানামা চলতে দেখা যায়।
ভোলাগামী যাত্রী মাহমুদ বলেন, বাসের তুলনায় লঞ্চে যাত্রা সহজ। এবার ভিড় কম থাকায় স্বস্তিতে যাত্রা করা যাচ্ছে। বরিশালগামী যাত্রী আসিফ বলেন, পরিবারের সঙ্গে লঞ্চযাত্রা তুলনামূলক আরামদায়ক। বৃষ্টির কারণে সড়কে ভোগান্তি থাকলেও নৌপথে পরিস্থিতি কিছুটা স্বস্তির। লঞ্চ সুপারভাইজার লিটন জানান, বৃষ্টির কারণে যাত্রী কিছুটা কম হলেও সন্ধ্যার পর চাপ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সদরঘাটে দায়িত্বশীল বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তারা জানান, ৩৩টি রুটে শতাধিক লঞ্চ চলাচল করছে এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
এদিকে রাজধানীর সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী ও আব্দুল্লাহপুর এলাকায় ঈদযাত্রাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক যানজট ও যাত্রী ভোগান্তি দেখা দিয়েছে। বাস সংকট, শিডিউল বিপর্যয় এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগে যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।
গাবতলী ও কমলাপুর এলাকায়ও যাত্রীচাপ থাকলেও কিছু ক্ষেত্রে আগাম টিকিট থাকায় তুলনামূলক স্বস্তি মিলেছে। রেলপথ ও নৌপথে যাত্রী সংখ্যা বাড়লেও সড়কপথেই ভোগান্তি সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, ভ্রাম্যমাণ আদালত এবং ট্রাফিক পুলিশ মাঠে কাজ করছে। তবে থেমে থেমে বৃষ্টি ও অতিরিক্ত চাপ পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
কমলাপুরে পাঁচ ট্রেন বিলম্বে যাত্রীদের ভোগান্তি: পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটির প্রথম ও ট্রেন যাত্রার তৃতীয় দিনে রাজধানীর ঢাকা রেলওয়ে স্টেশনে (কমলাপুর) ঘরমুখো মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। তবে ঈদযাত্রার এই ব্যস্ততার মাঝেই উত্তরাঞ্চলগামীসহ ৫টি ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়ের কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন হাজারো যাত্রী। রেল কর্তৃপক্ষ এটিকে ‘অপারেশনাল ডিলে’ এবং রেললাইনের ওপর স্থানীয়দের খড় শুকানোর কারণে ট্রেনের গতি কমে যাওয়াকে দায়ী করলেও, ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্ল্যাটফর্মে অপেক্ষা করতে গিয়ে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন যাত্রীরা। সোমবার (২৫ মে) সকালে ঢাকা রেলওয়ে স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, স্টেশনের পার্কিং এলাকা থেকেই ঘরমুখো মানুষের দীর্ঘ লাইন শুরু হয়েছে। যাত্রীদের শুরুতে বাঁশের তৈরি বিশেষ চেকিং এলাকা পার হতে হচ্ছে এবং পরে প্ল্যাটফর্মে প্রবেশের আগে আবারো টিকিট পরীক্ষা করছেন টিটিইরা। তবে প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে ভিন্ন চিত্র; সেখানে হাজারো মানুষ শিডিউল বোর্ডের দিকে তাকিয়ে উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তারা সবাই বিলম্বিত ট্রেনের যাত্রী এবং তাদের মধ্যে উত্তরাঞ্চলগামী মানুষের উপস্থিতিই সবচেয়ে বেশি। স্টেশন সূত্রে জানা গেছে, সকাল থেকে বিভিন্ন গন্তব্যের উদ্দেশ্যে প্রায় ১৫টি ট্রেন ছেড়ে গেছে। এর মধ্যে বেশিরভাগ ট্রেন নির্ধারিত সময়ে স্টেশন ত্যাগ করলেও ২টি ট্রেন বিলম্বে ছেড়েছে এবং আরো ২টি ট্রেন নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরও প্ল্যাটফর্ম ছাড়েনি। তথ্যমতে, সকাল ৬টার ধূমকেতু এক্সপ্রেস আধা ঘণ্টা পিছিয়ে সকাল সাড়ে ৬টায় এবং সকাল ৬টা ৪৫ মিনিটের নীলসাগর এক্সপ্রেস দীর্ঘ বিলম্বের পর সকাল ৮টা ১০ মিনিটে স্টেশন ছেড়ে যায়। অন্যদিকে, রংপুর এক্সপ্রেস সকাল ৯টা ১০ মিনিটে ছাড়ার কথা থাকলেও সেটির সম্ভাব্য সময় দেওয়া হয় সকাল ১০টা ৪৫ মিনিট। ব্রাহ্মণবাড়িয়াগামীমে তিতাস কমিটার ট্রেন ৯ট ৪৫ মিনিটে ছেড়ে যাওয়ার কথা থাকলেও সেটির বিলম্বিত সিডিউল দেওয়া হয়েছে সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে। এছাড়া সকাল ১০টা ১৫ মিনিটের একতা এক্সপ্রেস ট্রেনটি সকাল সাড়ে ১০টা পার হয়ে গেলেও তখন পর্যন্ত প্ল্যাটফর্মেই এসে পৌঁছায়নি। রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রী তরিকুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে বলেন, এক ঘণ্টা ধরে প্ল্যাটফর্মে এসে অপেক্ষা করছি। এখনো ট্রেন আসেনি। শিডিউলে দিয়ে রেখেছে দেড় ঘণ্টা বিলম্বের। না জানি আরো কত দেরি হয়। হাজার হাজার মানুষ অপেক্ষা করছেন।
স্টেশন সূত্রে জানা গেছে, আজ কমলাপুর স্টেশন থেকে মোট ৬৭টি ট্রেন বিভিন্ন গন্তব্যে ছেড়ে যাবে। এর মধ্যে ৪৪টি আন্তঃনগর ট্রেন, বাকিগুলো মেইল ও কমিউটার ট্রেন। ঈদযাত্রার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে কমলাপুর রেলস্টেশনের স্টেশন ম্যানেজার মো. কবীর উদ্দীন বলেন, এখন পর্যন্ত ঈদযাত্রা নির্বিঘ্নভাবেই চলছে। বেশিরভাগ ট্রেন সময়মতো ছেড়ে যাচ্ছে। তবে রংপুর এক্সপ্রেস কিছুটা দেরিতে আছে। রেললাইনের ওপর অনেক জায়গায় মানুষ খড় শুকায়, এজন্য ট্রেনকে গতি কমিয়ে চলতে হয়। এতে কয়েকটি ট্রেন দেরিতে এসেছে। এছাড়া যেসব ট্রেন আধা ঘণ্টা থেকে ৪০ মিনিট দেরিতে ছাড়ছে, সেগুলো মূলত অপারেশনাল ডিলে।
সানা/আপ্র/২৫/৫/২০২৬