অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে মাদক কেনাবেচা, সরবরাহ, বিজ্ঞাপন, মধ্যস্থতা বা লেনদেনের মতো অপরাধে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) বিল, ২০২৬ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। নতুন আইনে ডিজিটাল মাধ্যমে মাদক অপরাধ প্রমাণের ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছ থেকে সরাসরি মাদকদ্রব্য উদ্ধার হওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়নি।
সোমবার (১৩ জুলাই) জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি পাসের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। পরে জনমত যাচাই, বাছাই কমিটিতে পাঠানো এবং সংশোধনী প্রস্তাব নিষ্পত্তির পর কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়।
এর আগে গত ২৭ জুন বিলটি সংসদে উত্থাপনের পর পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। কমিটির সভাপতি আন্দালিভ রহমান পার্থের সভাপতিত্বে ২৮ ও ২৯ জুন বিলটি পর্যালোচনা করে সংশোধিত আকারে পাসের সুপারিশ করা হয়।
সংশোধিত আইনে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মোবাইল অ্যাপ, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ইলেকট্রনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা বা অন্য কোনো ডিজিটাল মাধ্যমে মাদকদ্রব্য কিংবা মাদকসদৃশ ক্ষতিকর পদার্থের কেনাবেচা, সরবরাহ, প্রস্তাব, বিজ্ঞাপন, মধ্যস্থতা, যোগাযোগ বা এ ধরনের কোনো অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনা করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
একইভাবে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা, ই-ওয়ালেট, ভার্চুয়াল সম্পদ বা ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করে মাদক লেনদেন কিংবা এ ধরনের কার্যক্রমের চেষ্টা করাও অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।
এ ধরনের অপরাধে যেকোনো মেয়াদের কারাদণ্ড অথবা মৃত্যুদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে, সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের মাধ্যমে বা পুনরায় একই অপরাধ সংঘটিত হলে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড, কারাদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
নতুন আইনে অপরাধে ব্যবহৃত ডিজিটাল অ্যাকাউন্ট, ডিভাইস, সাইবার মাধ্যম, ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা, ই-ওয়ালেট, ভার্চুয়াল সম্পদ বা ক্রিপ্টোকারেন্সি আদালত কিংবা মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালের আদেশে বন্ধ, অপসারণ, জব্দ, বাজেয়াপ্ত বা রাষ্ট্রের অনুকূলে নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
গঠন হবে পৃথক মাদক অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল
বিলে পাঁচ বছর বা তার বেশি কারাদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড কিংবা মৃত্যুদণ্ডযোগ্য মাদক অপরাধের বিচারের জন্য পৃথক **মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল** গঠনের বিধান রাখা হয়েছে।
সরকার জেলা বা মহানগর এলাকায় এক বা একাধিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে পারবে। অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজদের মধ্য থেকে একজনকে এসব ট্রাইব্যুনালের বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে।
ট্রাইব্যুনালের রায় বা আদেশের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে হাইকোর্ট বিভাগে আপিল করতে পারবেন।
মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে সাইবার ইউনিট ও ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব
নতুন আইনে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অধীনে মাদকসংক্রান্ত সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ শাখা এবং ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবরেটরি স্থাপনের বিধান রাখা হয়েছে।
তদন্তের প্রয়োজনে অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, সার্ভার, ক্লাউড স্টোরেজ, ডিজিটাল ওয়ালেটসহ সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত জব্দ, সংরক্ষণ এবং ফরেনসিক পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে পারবেন।
এ ছাড়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে বিশেষায়িত সংস্থা হিসেবে গড়ে তুলতে পোশাক ও আগ্নেয়াস্ত্রসজ্জিত জনবল ব্যবস্থার বিধান রাখা হয়েছে। দায়িত্ব পালনের সময় অনুমোদিত কর্মকর্তারা নির্ধারিত নিয়মে আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ বহন, ব্যবহার ও সংরক্ষণ করতে পারবেন।
অধিদপ্তর নিজস্ব অস্ত্রাগার স্থাপন করতে পারবে। কোনো গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটলে সরকার নির্ধারিত পদ্ধতিতে নির্বাহী তদন্ত করা হবে।
হাজতখানা ও মামলা ব্যবস্থাপনায় নতুন ব্যবস্থা
বিলে অধিদপ্তরের কার্যালয়ে হাজতখানা স্থাপনের সুযোগ রাখা হয়েছে। আদালতে উপস্থাপনের আগে মাদক মামলায় গ্রেফতার ব্যক্তিদের সেখানে নিরাপত্তা হেফাজতে রাখা যাবে। নারী ও পুরুষের জন্য পৃথক হাজতখানার ব্যবস্থা করতে হবে। শিশুদের ক্ষেত্রে শিশু আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া আদালত ভবনে প্রসিকিউশন শাখা স্থাপন, মামলা সমন্বয় এবং সাক্ষীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার সুযোগ রাখা হয়েছে। মাদক মামলার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে পৃথক মামলা ব্যবস্থাপনা পর্যবেক্ষণ সেল গঠনের বিধানও রয়েছে।
লাইসেন্স ছাড়া বেসরকারি মাদকাসক্তি নিরাময়, পুনর্বাসন বা পরামর্শকেন্দ্র পরিচালনা করলে সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
মাদক চক্রের মূল হোতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি
সংসদে বিলের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে সদস্যরা বলেন, মাদক মামলায় সাধারণত বাহক ও খুচরা বিক্রেতারা ধরা পড়লেও অনেক সময় মূল হোতা ও অর্থের উৎস শনাক্ত করা যায় না।
তারা মাদক সিন্ডিকেট, গডফাদার, অর্থের জোগানদাতা এবং চোরাচালান চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। পাশাপাশি সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশ বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্য মাদক কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের অপরাধে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
সানা/আপ্র/১৪/৭/২০২৬