গণভোটের রায় উপেক্ষা করে সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটি গঠন করা হচ্ছে-এমন অভিযোগ তুলে জাতীয় সংসদের অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেছেন বিরোধী দলের সদস্যরা। তারা দাবি করেছেন, জনগণের দেওয়া মতামতকে পাশ কাটিয়ে কোনো প্রক্রিয়ায় তারা অংশ নেবেন না। অন্যদিকে সরকার বলছে, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের জন্য সংবিধান সংশোধনের পথেই এগোতে হবে।
সোমবার (১৩ জুলাই) জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি। তিনি বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ লক্ষ্যেই সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দল, জোট ও স্বতন্ত্র সদস্যদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চিফ হুইপ জানান, প্রস্তাবিত কমিটি ছিল ১৭ সদস্যের। এতে বিএনপির সাতজন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির একজন, গণসংহতি আন্দোলনের একজন, গণঅধিকার পরিষদের একজন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের একজন, একজন স্বতন্ত্র সদস্য এবং বিরোধী দলের পাঁচজন সদস্য রাখার পরিকল্পনা ছিল।
তিনি বলেন, বিরোধী দলের কাছে একাধিকবার সদস্যদের নাম চাওয়া হলেও তারা কোনো নাম দেয়নি। এ কারণে আপাতত বিরোধী দলের জন্য নির্ধারিত পাঁচটি পদ শূন্য রেখে ১২ সদস্যের কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। পরবর্তীতে বিরোধী দল সদস্যদের নাম দিলে কমিটি পুনর্গঠন করা হবে।
প্রস্তাবের পর বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, তারা কখনোই কমিটিতে সদস্য দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেননি। তাদের অবস্থান শুরু থেকেই স্পষ্ট ছিল।
তিনি বলেন, “আমরা ধারণাগতভাবেই এই প্রস্তাব গ্রহণ করিনি। নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলো গণভোটের ফল বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছিল। সেই অঙ্গীকারের ভিত্তিতেই আমরা শপথ নিয়েছি।”
বিরোধী দলীয় নেতা অভিযোগ করেন, গণভোটের রায় পাশ কাটানোর উদ্দেশ্যে যদি এই কমিটি করা হয়, তাহলে তারা তা মেনে নেবেন না। তিনি বলেন, জনগণের মতামতকে সম্মান করাই গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি।
তার ভাষায়, “প্রায় ৬৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ যে মতামত দিয়েছেন, সেটিকে এভাবে উপেক্ষা করা হলে ভবিষ্যতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
বক্তব্য শেষে রাত ৯টা ২৫ মিনিটে বিরোধী দলের সদস্যরা অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করেন।
পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিরোধী দলের অবস্থান তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হতে পারে। তবে বর্তমান সংবিধানের কাঠামোর মধ্য থেকেই প্রয়োজনীয় সংশোধন করতে হবে।
তিনি বলেন, বর্তমান সংবিধানের অধীনেই নির্বাচন হয়েছে, সংসদ গঠিত হয়েছে এবং রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনা হয়েছে। জনগণের নতুন প্রত্যাশা পূরণে সংবিধান সংশোধন ছাড়া বিকল্প নেই।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্যও সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হবে। এ বিষয়ে আলোচনা ও সুপারিশ তৈরির উপযুক্ত জায়গা হচ্ছে সংসদের বিশেষ কমিটি।
তিনি জানান, কমিটি বিচার বিভাগ, আইনজীবী, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, বুদ্ধিজীবী, সংবাদপত্রের সম্পাদক, বিভিন্ন অংশীজন এবং জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সুপারিশ দেবে।
পরে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল কণ্ঠভোটে প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য দিলে তা গৃহীত হয়। এর মাধ্যমে বিরোধী দলের পাঁচটি পদ খালি রেখে ১২ সদস্যের সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়।
বিশেষ কমিটির সদস্য যারা
সংসদ নেতা তারেক রহমানের পক্ষে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি প্রস্তাবিত কমিটির সভাপতি করা হয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে।
কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন-চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল উদ্দিন, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন, সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদীন, শাকিলা ফারজানা, মাহমুদুল হক রুবেল, গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির আন্দালিভ রহমান পার্থ, গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. অলি উল্লাহ।
সংবিধান সংশোধন নিয়ে বর্তমান রাজনৈতিক মতপার্থক্যের সূত্রপাত জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন ঘিরে। চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধান, বিচার বিভাগ, পুলিশ, দুর্নীতি দমন কমিশন, নির্বাচন ব্যবস্থা ও জনপ্রশাসনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়।
পরবর্তীতে বিভিন্ন কমিশনের সুপারিশ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা ও সংলাপের পর জুলাই জাতীয় সনদ গ্রহণ করা হয়। এরপর রাষ্ট্রপতির আদেশের ভিত্তিতে গণভোট আয়োজন করা হয়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে অনুষ্ঠিত ওই গণভোটে প্রায় ৬৯ শতাংশ ভোট সংবিধান সংস্কারের পক্ষে পড়ে বলে জানানো হয়। তবে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের পদ্ধতি এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদে শপথ নেওয়া নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
এই বিরোধই শেষ পর্যন্ত সংসদে বিশেষ কমিটি গঠন ও বিরোধী দলের ওয়াকআউটের মধ্য দিয়ে নতুন রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
সানা/আপ্র/১৪/৭/২০২৬