রাষ্ট্রের ইতিহাসে কিছু মানুষের প্রস্থান কেবল একটি জীবনের অবসান নয়; তা একটি মূল্যবোধ, একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং একটি প্রাতিষ্ঠানিক ঐতিহ্যেরও ক্ষয়কে সামনে নিয়ে আসে। সাবেক ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার, বরেণ্য আইনজীবী ও প্রবীণ রাজনীতিক ব্যারিস্টার মুহাম্মদ জমির উদ্দিন সরকারের প্রয়াণ তেমনই এক শূন্যতার সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘ কর্মময় জীবনে তিনি যে সততা, প্রজ্ঞা, শালীনতা ও সাংবিধানিক দায়বদ্ধতার পরিচয় রেখে গেছেন, তা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক ইতিহাসে দীর্ঘদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের জীবন ছিল ক্ষমতার নয়, দায়িত্বের; ব্যক্তিস্বার্থের নয়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। আইনজীবী হিসেবে তিনি পেশাগত সততা ও দক্ষতার জন্য যেমন সম্মান অর্জন করেছিলেন, তেমনি রাজনীতিক হিসেবে শিষ্টাচার, সংযম ও নীতিনিষ্ঠ আচরণের মাধ্যমে নিজেকে আলাদা উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। স্পিকার হিসেবে সংসদ পরিচালনা, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা কিংবা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন-প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি প্রমাণ করেছেন, রাষ্ট্র পরিচালনার প্রকৃত শক্তি প্রজ্ঞা, ধৈর্য এবং ন্যায়বোধে নিহিত।
তাঁর মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, সরকার ও বিরোধী দলের নেতাদের অভিন্ন শোকপ্রকাশ এবং জাতীয় সংসদে সর্বসম্মত শোকপ্রস্তাব গ্রহণ শুধু একজন ব্যক্তির প্রতি সম্মান নয়; এটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও গণতান্ত্রিক চর্চার প্রতি সম্মিলিত শ্রদ্ধারও বহিঃপ্রকাশ। জাতীয় সংসদ প্রাঙ্গণে জানাজা এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর দাফন জাতির কৃতজ্ঞতার প্রতীক হয়ে থাকবে। এমন সম্মান অর্জন করেন তাঁরাই, যাঁরা ব্যক্তিগত অর্জনের গণ্ডি পেরিয়ে রাষ্ট্রের ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠেন।
আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের জীবন আরো বেশি প্রাসঙ্গিক। রাজনীতিতে যখন পারস্পরিক অবিশ্বাস, অসহিষ্ণুতা এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক অবস্থান প্রায়ই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে, তখন তাঁর কর্মজীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়-গণতন্ত্রের শক্তি উচ্চকণ্ঠে নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের প্রতি শ্রদ্ধা, আইনের শাসনের প্রতি অঙ্গীকার এবং ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতায়। তিনি দেখিয়েছেন, মতাদর্শে দৃঢ় থেকেও রাজনৈতিক সৌজন্য বজায় রাখা যায়; ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকেও বিনয় ও আত্মসংযম হারাতে হয় না।
রাষ্ট্রের জন্য এটিই আত্মসমালোচনার সময়। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে, যেখানে ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান হবে সর্বাগ্রে; প্রতিপক্ষ নয়, গণতান্ত্রিক সহাবস্থান হবে রাজনীতির ভিত্তি; আর ক্ষমতা নয়, জনকল্যাণ ও সাংবিধানিক দায়বদ্ধতাই হবে নেতৃত্বের প্রধান পরিচয়। নতুন প্রজন্মের রাজনীতিকদের জন্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের জীবন হতে পারে সততা, প্রজ্ঞা, শিষ্টাচার ও দায়িত্বশীল নেতৃত্বের এক অনন্য পাঠশালা।
মৃত্যু অনিবার্য, কিন্তু কর্ম ও আদর্শ মানুষের প্রকৃত পরিচয় বহন করে যুগের পর যুগ। ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার তাঁর কর্ম, চরিত্র ও রাষ্ট্রচিন্তার মধ্য দিয়ে সেই অমরত্বই অর্জন করেছেন। তাঁর প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা জানানো হবে তখনই, যখন বাংলাদেশের রাজনীতি আরো সহিষ্ণু হবে, সংসদ আরো কার্যকর হবে, আইনের শাসন আরো সুদৃঢ় হবে এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মর্যাদা রক্ষায় সবাই আন্তরিক ভূমিকা পালন করবে। একজন প্রজ্ঞাবান প্রহরীর বিদায় তাই কেবল শোকের নয়; এটি রাষ্ট্রের জন্য এক গভীর শিক্ষা, এক অনন্ত প্রেরণা।
সানা/আপ্র/১৪/৭/২০২৬