গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

প্রকৃতির রুদ্ররোষে বিপন্ন জনপদ, দুর্যোগ মোকাবিলায় চাই নতুন দর্শন

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১৪:১৫ পিএম, ১৩ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ০৭:৪১ এএম ২০২৬
প্রকৃতির রুদ্ররোষে বিপন্ন জনপদ, দুর্যোগ মোকাবিলায় চাই নতুন দর্শন
ছবি

ফাইল ছবি

প্রকৃতি কখনো সতর্ক করে, কখনো কঠিন পরীক্ষায় ফেলে। সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধস দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে যে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে, তা শুধু একটি মৌসুমি দুর্যোগের চিত্র নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রস্তুতি, পরিকল্পনা ও সক্ষমতার সামনে এক বড় প্রশ্নচিহ্ন। কয়েক দিনের প্রবল বর্ষণে সাত জেলার বিস্তীর্ণ জনপদ পানির নিচে তলিয়ে গেছে। প্রাণ হারিয়েছেন ৪৪ জন, আহত হয়েছেন অনেকে, আর দুর্ভোগে পড়েছেন ১০ লাখের বেশি মানুষ। অসংখ্য পরিবার হারিয়েছে ঘরবাড়ি, জীবিকার অবলম্বন ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রার নিশ্চয়তা।

চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির পাহাড়ি এলাকায় বন্যা ও পাহাড়ধসের ভয়াবহতা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়েছে। কোথাও সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, কোথাও সেতু ভেঙে পড়েছে, কোথাও বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা অচল হয়ে গেছে। চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় হাসপাতাল পর্যন্ত পানির নিচে তলিয়ে গিয়ে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হয়েছে। কক্সবাজারে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি রোহিঙ্গা শিবিরেও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এসব দৃশ্য শুধু একটি দুর্যোগের ক্ষতচিহ্ন নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য বড় সতর্কবার্তা।

সরকার ইতোমধ্যে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় উদ্ধার, ত্রাণ ও চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। প্রশাসন, সেনাবাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অনেক দুর্গম এলাকায় সহায়তা পৌঁছেছে। দুর্যোগের মুহূর্তে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের পাশাপাশি মানুষের মানবিক সহযোগিতার এই দৃশ্য প্রশংসনীয়।

তবে বাস্তবতা হলো, প্রতি বছর দুর্যোগের পর একই ধরনের ক্ষয়ক্ষতির চিত্র দেখতে হলে শুধু ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এখন সময় এসেছে দুর্যোগ মোকাবিলার প্রচলিত ধারণা থেকে বেরিয়ে নতুন দর্শন গ্রহণের। দুর্যোগকে কেবল পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার বিষয় হিসেবে নয়, বরং আগাম প্রস্তুতি, ঝুঁকি হ্রাস ও টেকসই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

প্রথমত, পাহাড়ি অঞ্চল, নদী অববাহিকা ও উপকূলীয় এলাকাগুলোতে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি চিহ্নিত করে নিরাপদ পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিতে হবে। পাহাড় কাটা, অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ ও প্রাকৃতিক জলাধার ধ্বংস বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন। কারণ প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে দুর্যোগের ভয়াবহতা আরো বাড়ে।

দ্বিতীয়ত, আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও আগাম সতর্কবার্তা সাধারণ মানুষের কাছে দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা আরো কার্যকর করতে হবে। প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে স্থানীয় পর্যায়ে দুর্যোগ প্রস্তুতি কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক দল তৈরি করা গেলে দুর্যোগের প্রথম মুহূর্তে প্রাণহানি কমানো সম্ভব।

তৃতীয়ত, ত্রাণ ব্যবস্থাপনায় আরো সমন্বিত ও স্বচ্ছ কাঠামো প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রে সহায়তার অভাবের চেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় দুর্গম এলাকায় দ্রুত সহায়তা পৌঁছাতে না পারা। তাই সরকারি সংস্থা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসনকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সহায়তা কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন। শুধু ঘর তুলে দেওয়া নয়, মানুষের জীবিকা ফিরিয়ে দেওয়াও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। তাই ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজন শক্তিশালী রাজনৈতিক সদিচ্ছা, বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা ও জনগণের অংশগ্রহণ। প্রকৃতির রুদ্ররোষ থামানো মানুষের হাতে নেই, কিন্তু এর ক্ষতি কমানোর দায়িত্ব মানুষেরই।

আজকের বন্যা আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে-দুর্যোগ আসার পর প্রস্তুতি নয়, দুর্যোগের আগেই প্রস্তুতিই হতে হবে রাষ্ট্রীয় দর্শনের মূল ভিত্তি। একটি নিরাপদ, সহনশীল ও দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষম বাংলাদেশ গড়ে তুলতে এখনই নিতে হবে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর পদক্ষেপ। 
সানা/আপ্র/১৩/৭/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

নির্ধারিত দামে এলপিজি নিশ্চিত করুন, ভোক্তাকে জিম্মি করা বন্ধ হোক
১৪ অক্টোবর ২০২৬

নির্ধারিত দামে এলপিজি নিশ্চিত করুন, ভোক্তাকে জিম্মি করা বন্ধ হোক

জ্বালানি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য উপকরণ। অথচ সরকার নির্ধারিত দামেও যদি রান্নার গ্যাস না মেল...

প্রবাসীর প্রাণ, আঞ্চলিক শান্তি ও মানবিক নিরাপত্তার কঠিন পরীক্ষা
১৩ অক্টোবর ২০২৬

প্রবাসীর প্রাণ, আঞ্চলিক শান্তি ও মানবিক নিরাপত্তার কঠিন পরীক্ষা

প্রবাসে উপার্জিত অর্থ বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করে, অসংখ্য পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখে। অথচ সেই উপার্জ...

রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে কালি, অসহিষ্ণুতার অশনিসংকেত
১২ অক্টোবর ২০২৬

রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে কালি, অসহিষ্ণুতার অশনিসংকেত

রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সামনের দেয়ালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতি...

বন্দরের নিয়ন্ত্রণে জাতীয় স্বার্থ, চুক্তিতে চাই পূর্ণ স্বচ্ছতা
১০ অক্টোবর ২০২৬

বন্দরের নিয়ন্ত্রণে জাতীয় স্বার্থ, চুক্তিতে চাই পূর্ণ স্বচ্ছতা

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনায় সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

পরিচয় যা-ই হোক, চাঁদাবাজ-দখলদারদের ছাড় নয়: ডিএমপি কমিশনার

চাঁদাবাজ, ভূমি দখলবাজ ও মাদক কারবারে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় বা অবস্থান বিবেচনা না করে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দীন আহমদ। এসব অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে কোনো ধরনের শিথিলতা দেখানো যাবে না বলেও নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকালে ডিএমপি সদর দপ্তরের সম্মেলনকক্ষে সেপ্টেম্বর মাসের মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় উপস্থিত ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে এসব নির্দেশনা দেন কমিশনার। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন- কমিশনার যে নির্দেশনা দিয়েছেন, পুলিশ সদস্যরা তা বাস্তবে তা করতে পারবেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 1 দিন আগে