বাংলাদেশ এখন এক বহুমাত্রিক স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখোমুখি। একদিকে টানা বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও বন্যায় দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত। অন্যদিকে ডেঙ্গুর সংক্রমণও ধীরে ধীরে ঊর্ধ্বমুখী। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা সাড়ে সাত হাজার ছাড়িয়েছে, প্রাণ গেছে ২২ জনের। সম্প্রতি এক দিনেই আরো তিনজনের মৃত্যু এবং ২৫১ জনের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনা স্পষ্ট করে দিচ্ছে, পরিস্থিতিকে হালকাভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই।
বর্ষাকাল শেষ হওয়ার আগেই আমাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হওয়া উচিত বন্যার পরবর্তী সময়। কারণ বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর অসংখ্য জায়গায় জমে থাকা পরিষ্কার ও অল্প দূষিত পানিই এডিস মশার আদর্শ প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়। অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, বৃষ্টির পরপরই যদি কার্যকর মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি শুরু না হয়, তবে অল্প সময়ের মধ্যেই ডেঙ্গুর সংক্রমণ বিস্ফোরক রূপ নিতে পারে। বিশেষজ্ঞরাও সতর্ক করছেন, বর্তমান আবহাওয়া এডিস মশার বিস্তারের জন্য অত্যন্ত অনুকূল এবং দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে আগামী কয়েক মাসে সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
এবারের পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে দেশের সাম্প্রতিক হামের প্রাদুর্ভাব। কয়েক মাস ধরে এই রোগে বহু শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং এখনো প্রতিদিন নতুন আক্রান্তের খবর মিলছে। একটি সংক্রামক রোগের চাপ যখন পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থা বহন করছে, তখন একই সময়ে ডেঙ্গুর ব্যাপক বিস্তার ঘটলে হাসপাতাল, চিকিৎসক, শয্যা, ওষুধ এবং নিবিড় পরিচর্যা-সবকিছুর ওপর অসহনীয় চাপ তৈরি হবে। এর পরিণতি শুধু ডেঙ্গু রোগীদের জন্য নয়, সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবার জন্যও ভয়াবহ হতে পারে।
এই বাস্তবতায় সবচেয়ে জরুরি হলো আগাম প্রতিরোধ। ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই শুরু হয় হাসপাতালের শয্যায় নয়, শুরু হয় ঘরের আঙিনা, ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন, ড্রাম, টব, টায়ার ও যেকোনো পানি জমে থাকা স্থান পরিষ্কার করার মধ্য দিয়ে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদকে এখন থেকেই সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। নিয়মিত লার্ভা ধ্বংস, বৈজ্ঞানিকভাবে মশকনাশক প্রয়োগ, জলাবদ্ধতা দূরীকরণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। কেবল প্রতীকী কর্মসূচি নয়, মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান ও ফলপ্রসূ অভিযান চালানোই সময়ের দাবি।
একই সঙ্গে প্রয়োজন জনসচেতনতার নতুন ঢেউ। প্রতিটি পরিবারকে সপ্তাহে অন্তত এক দিন নিজেদের বাসাবাড়ি ও আশপাশে কোথাও তিন দিনের বেশি পানি জমে আছে কি না, তা পরীক্ষা করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। জ্বরকে অবহেলা না করে দ্রুত পরীক্ষা ও চিকিৎসা নেওয়ার সংস্কৃতিও গড়ে তুলতে হবে। বিদ্যালয়, মসজিদ, সামাজিক সংগঠন এবং গণমাধ্যমকে এই সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে আরো সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
ডেঙ্গু আজ আর শুধু নগরকেন্দ্রিক রোগ নয়; এটি ক্রমেই গ্রামাঞ্চলেও বিস্তার লাভ করছে। তাই প্রস্তুতিও হতে হবে সারাদেশব্যাপী। প্রতিটি জেলা হাসপাতালে পর্যাপ্ত শয্যা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, রক্তের উপাদান এবং প্রশিক্ষিত চিকিৎসক নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিয়মিত রোগতাত্ত্বিক নজরদারি জোরদার করতে হবে।
স্বাস্থ্যদুর্যোগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হলো বিপর্যয় শুরু হওয়ার আগেই তাকে ঠেকানো। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার অপেক্ষা না করে আজই যদি মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সর্বাত্মক অভিযান শুরু করা যায়, তবে অসংখ্য মানুষকে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে। অন্যথায় হামের ক্ষত শুকানোর আগেই ডেঙ্গু দেশের জন্য আরেকটি বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হতে পারে। সেই ঝুঁকি এড়াতে এখনই প্রয়োজন রাষ্ট্র, স্থানীয় প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত ও নিরবচ্ছিন্ন উদ্যোগ।
সানা/আপ্র/১১/৭/২০২৬